প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো ধারণা নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনের নীরব অংশীদার। আমরা সচেতন হই বা না হই, প্রতিটি দিন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এআই আমাদের সিদ্ধান্ত, পছন্দ এবং আচরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
সকালের একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করা যাক। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে হাতে তুলে নেওয়া হলো মুঠোফোন। অ্যালার্ম বন্ধ করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারা। চোখে পড়ছে এমন পোস্ট, যা আপনার পছন্দের সঙ্গে মিলে যায়। প্রিয় লেখকের লেখা, কাছের মানুষের ছবি কিংবা আগ্রহের কোনো ভিডিও। অনেকেই ভাবেন, এসব কাকতালীয়ভাবে সামনে আসে। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। প্রতিটি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার এমনকি কোনো পোস্টে কতক্ষণ চোখ রাখা হয়েছে, তাও বিশ্লেষণ করে জটিল অ্যালগরিদম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর আগ্রহের ভিত্তিতে আলাদা এক ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করে দেয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি নিজেরাই বেছে নিচ্ছি, নাকি আমাদের জন্য বেছে দেওয়া হচ্ছে।
সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। কেউ যদি লিখেন, ‘পিকনিকে কোথায় যাওয়া যায়?’, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চলে আসে অসংখ্য প্রস্তাব। শুধু শব্দ বিশ্লেষণ নয়, ব্যবহারকারীর অবস্থান, পূর্ববর্তী সার্চ ইতিহাস, ব্যবহৃত যন্ত্র এবং আগ্রহের ধরন সবকিছু বিবেচনায় নেয় সিস্টেম। কেউ যদি আগে পাহাড়ভিত্তিক ভ্রমণ নিয়ে বেশি খোঁজ করে থাকেন, তবে তার সামনে সেই ধরনের গন্তব্যই বেশি আসার সম্ভাবনা থাকে।
রাস্তায় বের হওয়ার আগে ম্যাপ খুললে যে যানজট পরিস্থিতি দেখা যায়, সেটিও এআইয়ের ফল। লাখো ব্যবহারকারীর ডেটা বিশ্লেষণ করে রিয়েল টাইমে হিসাব করা হয় কোথায় গাড়ির গতি কম, কোথায় চাপ বেশি। ব্যবহারকারী মনে করেন তিনি নিজেই দ্রুত পথটি বেছে নিয়েছেন, অথচ তার আগেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত প্রস্তুত থাকে।
ভিডিও প্ল্যাটফর্মেও একই চিত্র। একটি ভিডিও দেখার পর ধারাবাহিকভাবে আরেকটি ভিডিও সামনে আসে। ইউটিউব বা নেটফ্লিক্সের সুপারিশভিত্তিক ফিচার ব্যবহারকারীর দেখা, দেখা বন্ধ করা কিংবা এড়িয়ে যাওয়া কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে পরবর্তী প্রস্তাব সাজায়। এতে সময় অজান্তেই কেটে যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজের পছন্দে দেখছি, নাকি আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পরিকল্পিত উপায়ে কনটেন্ট উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা খাতেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হঠাৎ কোনো সন্দেহজনক লেনদেনের চেষ্টা হলে ব্যাংক থেকে সতর্কবার্তা আসে। পূর্ববর্তী লেনদেনের ধরন, সময় ও স্থান বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা হয়। এটি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট হয় যে সিস্টেম ব্যবহারকারীর আচরণ গভীরভাবে জানে।
ই-কমার্স ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কোনো পণ্য দেখে রেখে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে তার বিজ্ঞাপন আবার সামনে আসে। অ্যামাজন বা দারাজের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর দেখা, কার্টে রাখা কিংবা উপেক্ষা করা পণ্য বিশ্লেষণ করে বিক্রির সম্ভাবনা বাড়ায়। এতে প্রশ্ন তৈরি হয়, আমরা কি পণ্য খুঁজছি, নাকি পণ্য আমাদের খুঁজে নিচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতে এআইয়ের ব্যবহার আরও সংবেদনশীল। এক্স-রে বা এমআরআই ছবিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করে সিস্টেম চিকিৎসকদের বিশ্লেষণে সহায়তা করছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হওয়াও সম্ভব হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চিকিৎসক নেন, তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষণে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে নির্ভরশীলতার প্রশ্নও সামনে আসে।
বাংলাদেশেও এআইয়ের বিস্তার ঘটছে ধীরে ধীরে। ফিনটেক, টেলিযোগাযোগ, ই-কমার্স এবং শিক্ষাক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মেশিন লার্নিং ও ডেটাসায়েন্স পড়ানো হচ্ছে। অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীর শেখার ধরন বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট সাজিয়ে দিচ্ছে। কেউ যদি কোনো অধ্যায়ে বারবার ভুল করেন, সিস্টেম তা শনাক্ত করছে।
এআই জীবন সহজ করছে, সময় বাঁচাচ্ছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে সহায়তা দিচ্ছে। তবে ঝুঁকিও রয়েছে। অনেকেই অ্যাপ ব্যবহারের শর্তাবলি না পড়ে তথ্য শেয়ার করেন। ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থান, যোগাযোগের তথ্য ও ব্রাউজিং অভ্যাস বিভিন্ন সিস্টেমে জমা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধীরাও উন্নত ফিশিং কৌশলে এআই ব্যবহার করছে।
বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের বর্তমানের অংশ। এটি নিজে ভালো বা খারাপ নয়। ব্যবহার নির্ভর করছে মানুষের ওপর। প্রয়োজন সচেতনতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নৈতিক বোঝাপড়া। প্রযুক্তিকে বুঝে ব্যবহার করা গেলে এটি সহায়ক শক্তি হয়ে থাকবে, অন্যথায় অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।







Add comment