প্রায় সাত কোটি বছর আগের ডাইনোসরের জীবাশ্মীভূত একটি ডিমের সন্ধান মিলেছে দক্ষিণ আমেরিকায়। আর্জেন্টিনার একটি স্বনামধন্য জাদুঘরের ল্যাবরেটরি অব কমপ্যারেটিভ অ্যানাটমি অ্যান্ড ইভল্যুশন অব ভার্টিব্র্যাটেসের গবেষকেরা সাম্প্রতিক অভিযানে এ আবিষ্কার করেন। ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া ডিমটি কোনো মাংসাশী ডাইনোসরের।
ডাইনোসর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চলছে। বিশালদেহী এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর চেহারা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট চিত্র থাকলেও সরাসরি প্রমাণ সীমিত হওয়ায় গবেষকেরা প্রধানত জীবাশ্মের ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবনধারা ও গঠন বিশ্লেষণ করে থাকেন। সেই ধারাবাহিকতায় এই নতুন আবিষ্কারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংসাশী ডাইনোসরের জীবাশ্মীভূত ডিম প্রকৃতিতে অত্যন্ত বিরল। সাধারণত লম্বা গলার তৃণভোজী সরোপডদের ডিম গোলাকৃতি ও তুলনামূলক মোটা খোলসবিশিষ্ট হয়ে থাকে। কিন্তু সদ্য উদ্ধার হওয়া ডিমটি ডিম্বাকৃতির এবং আকারে আধুনিক পাখির ডিমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এর খোলসে বিশেষ ধরনের দাগ ও গঠন লক্ষ্য করা গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় এটি সম্ভবত এমন এক প্রজাতির, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা ছিল না।
প্রাথমিক পর্যায়ে গবেষকেরা ডিমটিকে স্থানীয় ছোট আকারের থেরোপড প্রজাতি বোনাপার্টেনিকাসের বলে সন্দেহ করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে সেই ধারণা দুর্বল হয়ে এসেছে। এ কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ডিমটির মাইক্রো সিটি স্ক্যান করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদি স্ক্যানের মাধ্যমে ডিমের ভেতরে ভ্রূণের কঙ্কাল শনাক্ত করা যায়, তবে তা থেকে ডাইনোসরের জন্মপূর্ব শারীরিক গঠন, বৃদ্ধি প্রক্রিয়া এবং শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থার বিষয়ে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আর্জেন্টিনায় এর আগে কেবল তৃণভোজী সরোপড ডাইনোসরের ভ্রূণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। সে তুলনায় মাংসাশী ডাইনোসরের সম্ভাব্য ভ্রূণ পাওয়া গেলে তা গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষত প্রজনন আচরণ ও বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে এটি সহায়ক হতে পারে।
উদ্ধারস্থলের আশপাশে রোকাসরাস মুনিওজি নামের একটি টাইটানোসরের জীবাশ্মও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ভাঙা ও ক্ষয়প্রাপ্ত একাধিক ডিমের খোলসের উপস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে ওই এলাকা সম্ভবত ডাইনোসরদের আবাসস্থল বা প্রজননকেন্দ্র ছিল। এই প্রেক্ষাপটে গবেষকেরা ধারণা করছেন, সেখানে একাধিক ডাইনোসর ডিম পাড়ত এবং সেটি ছিল একটি সক্রিয় বাসা এলাকা।
ল্যাবরেটরির এক গবেষক জানান, এ আবিষ্কার কেবল একটি প্রাচীন ডিমের সন্ধান নয়; বরং এটি পাখির মতো অভিভাবকসুলভ আচরণের বিবর্তনীয় ধারার অনুসন্ধানে সহায়তা করতে পারে। ডাইনোসর ও আধুনিক পাখির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। নতুন প্রমাণ সেই সম্পর্কের আরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে সাত কোটি বছরের পুরোনো এই জীবাশ্মীভূত ডিম আবিষ্কার ডাইনোসর গবেষণায় তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পরীক্ষায় যদি এর ভেতরে সুস্পষ্ট ভ্রূণ কাঠামো পাওয়া যায়, তবে তা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণিজগতের বিকাশ, আচরণ এবং বিবর্তন সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা দিতে সক্ষম হবে।







Add comment