প্রাণঘাতী সংক্রমণে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের একটি বেসরকারি চিড়িয়াখানায় গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ৭২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতায় একের পর এক বাঘের মৃত্যুর ঘটনায় দেশটির প্রাণিসম্পদ খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে চিয়াং মাইয়ের প্রাদেশিক প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানায়, পরীক্ষায় অত্যন্ত সংক্রামক ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে এমন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, এই দুই ধরনের সংক্রমণের যৌথ প্রভাবে বাঘগুলোর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
জাতীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিচালক স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, বড় বন্য প্রাণীর অসুস্থতা শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে জটিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিড়াল বা কুকুরের মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে অসুস্থতার লক্ষণ দ্রুত ধরা পড়লেও বাঘের ক্ষেত্রে তা সহজে বোঝা যায় না। তিনি বলেন, যখন নিশ্চিতভাবে বোঝা গেছে যে প্রাণীগুলো অসুস্থ, তখন পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
যে প্রতিষ্ঠানে এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে সেটির নাম টাইগার কিংডম। উত্তরাঞ্চলের এই চিড়িয়াখানাটি পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি গন্তব্য। শনিবার এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তাদের ওয়েবসাইটে দর্শনার্থীদের জন্য বাঘ স্পর্শ করা এবং বড় আকারের এসব বন্য প্রাণীর সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগের প্রচার রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের বিস্তার দ্রুত হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক হিসেবে পরিচিত, যা বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। শ্বাসতন্ত্রে প্রভাব ফেলা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। এই দুই ধরনের সংক্রমণ একসঙ্গে থাকলে প্রাণীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রাণী অধিকার সংগঠন পেটা এশিয়া এএফপিকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, বাঘগুলো দুর্দশা, বন্দিত্ব ও ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করছিল এবং একই পরিবেশে তাদের মৃত্যু হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, পর্যটকেরা যদি এ ধরনের স্থান এড়িয়ে চলেন, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত অলাভজনক হয়ে পড়বে। তাদের মতে, তাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
চিড়িয়াখানাটির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রিক কার্যক্রম, যেখানে বন্য প্রাণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের সুযোগ দেওয়া হয়, তা সংক্রমণ বিস্তারে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না সে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
প্রাদেশিক প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানিয়েছে, পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংক্রমণের উৎস ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে ৭২টি বাঘের মৃত্যু প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
উত্তরাঞ্চলের এই চিড়িয়াখানায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেশটির বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংক্রমণ শনাক্তে বিলম্ব এবং দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে। এদিকে প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো পর্যটননির্ভর বন্যপ্রাণী প্রদর্শন ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের দাবি জোরদার করছে।







Add comment