বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের শঙ্কা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলেছে। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতিও চলছে। এই দ্বৈত পরিস্থিতির প্রভাবেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭১ ডলার ২২ সেন্টে দাঁড়ায়, যা আগের দিনের তুলনায় ৪৫ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ফিউচার্সের মূল্য ৪২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলার ৫ সেন্টে পৌঁছায়।
এর আগে গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড ৩১ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছিল। আর সোমবার ডব্লিউটিআই ক্রুড ৪ আগস্টের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদার হওয়ার পর থেকে এই দুই সূচক উচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে। ইরানকে তার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতায় আসতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। ওপেকভুক্ত দেশ এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদক ইরান থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই বাজারে সতর্কতা বাড়ছে।
আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলে থাকবেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। কূটনৈতিক তৎপরতার এই ধাপকে অনেকেই পরিস্থিতি প্রশমনের একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার দ্বার এখনও খোলা আছে।
এদিকে আইজি মার্কেটের এক বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে দিয়েছেন, কোনো সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি অত্যন্ত নেতিবাচক দিকে যেতে পারে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। তবে তেহরান এই দাবির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি নতুন এক মাত্রা যুক্ত হয়েছে চীনের জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনা নিয়ে ইরানের আলোচনার খবরে। বিশেষ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের অস্ত্র ইরানের উপকূলে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে স্থাপন করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র অর্জন করলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে মার্কিন নৌবাহিনীর ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতিও দামের গতিপ্রকৃতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন বর্তমানে চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় অবস্থান নিচ্ছেন।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ২০ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল। একই সময়ে পেট্রোল ও ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত কমেছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বুধবার প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রতিবেদন তেলের দামের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।







Add comment