শৈশব ও কৈশোরে মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করে। এই সময় নিউরনের মধ্যে বিপুল পরিমাণ নতুন সংযোগ তৈরি হয়। জীবনের প্রথম কয়েক বছরে প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য স্নায়ু সংযোগ গড়ে ওঠে, যা শেখা ও বোঝার ক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার গতি কমতে শুরু করে। নতুন স্নায়ু সংযোগ তৈরির হার কমে যায় এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রম ধীর হতে থাকে। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত কিছু অনুশীলন ও জীবনধারায় সচেতন পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা সক্রিয় রাখা সম্ভব।
শরীর সুস্থ রাখতে যেমন নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি, তেমনি মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে প্রয়োজন মানসিক সক্রিয়তা। পড়াশোনা, পেশাগত কাজ, সামাজিক মেলামেশা ও বিভিন্ন শখের চর্চা মিলে তৈরি হয় ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’। এটি এমন এক মানসিক ভান্ডার, যা মস্তিষ্ককে বিকল্প পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করে এবং ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। সহজ ভাষায়, কগনিটিভ রিজার্ভ হলো সেই সক্ষমতা, যা মস্তিষ্কে আঘাত বা ক্ষতি হলেও জ্ঞানগত কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন তরুণ ও সক্রিয় রাখতে কার্যকর পাঁচটি উপায় নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, নতুন কিছু শেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। জ্ঞানগত স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় যুক্তি বিশ্লেষণের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, মনোযোগ ধরে রাখা এবং দ্রুত তথ্য অনুধাবন করার দক্ষতা। বয়স বাড়লে এসব কিছুটা ধীর হতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। স্কটল্যান্ডের হেরিয়ট ওয়াট ইউনিভার্সিটির একজন মনোবিজ্ঞানীর মতে, জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মস্তিষ্ককে শক্তিশালী রাখার সুযোগ রয়েছে। নতুন কিছু শেখা যেমন বাগান করা, নতুন ভাষা রপ্ত করা বা ভিন্ন কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়া মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাগান চর্চা জ্ঞানগত সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক। পাশাপাশি নতুন ভাষা শেখা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে সক্রিয় রাখে এবং আলঝেইমারের লক্ষণ প্রকাশের সময় গড়ে প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সঠিক খাবারের ভূমিকা বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঁশসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণকারীদের তিন মাস পর জ্ঞানগত কর্মক্ষমতা উন্নত হয়েছে। শরীরে স্বাস্থ্যকর চর্বিও প্রয়োজন। ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ মাছ এবং আখরোটে থাকা পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট মস্তিষ্কের সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ডিম খাওয়াও উপকারী বলে মনে করা হয়। ডিমে থাকা কোলিন স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কোলিনের অভাব হলে পারকিনসনস ও আলঝেইমারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের পাশাপাশি মনকেও সুস্থ রাখে। সবার পক্ষে ভারী ব্যায়াম করা সম্ভব না হলেও হালকা ব্যায়াম বা নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে নিয়মিত ব্যায়ামকারীদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। ব্যায়াম মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে শক্তিশালী করে, যা আলঝেইমারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। পাশাপাশি এটি মন ভালো রাখতে ও বিষণ্নতা কমাতে কার্যকর।
চতুর্থত, সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সামাজিক সংযোগকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিয়মিত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, ভ্রমণ করা বা নতুন কোনো কোর্সে যুক্ত হওয়া মানসিক শক্তি বাড়ায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সঠিকভাবে প্রশ্ন করা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় পারস্পরিক আত্ম উন্মোচন, যা মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পঞ্চমত, বড় পরিবর্তনের বদলে ছোট কিন্তু ধারাবাহিক পরিবর্তনে গুরুত্ব দিন। ধারণা আছে, ভালো থাকতে হলে বড় ধরনের রূপান্তর প্রয়োজন। তবে গবেষণা বলছে, নিয়মিত ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। ফিনল্যান্ডের ঐতিহাসিক ফিঙ্গার স্টাডিতে ৬০ থেকে ৭৭ বছর বয়সী ১ হাজার ২৬০ জনকে দুই দলে ভাগ করা হয়। একদল দুই বছর ধরে খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, মানসিক প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কার্যক্রমের সমন্বিত কর্মসূচিতে অংশ নেয়। অন্য দলটি ছিল নিয়ন্ত্রণ দল, যারা সাধারণ স্বাস্থ্য পরামর্শ পায়। দেখা যায়, সমন্বিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের জ্ঞানগত উন্নতি নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মস্তিষ্ক তরুণ রাখতে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং দৃঢ় সামাজিক সম্পর্কের মতো ছোট ছোট পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলে। তাই সচেতন জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সক্রিয় ও সজীব মস্তিষ্ক বজায় রাখা সম্ভব।







Add comment