আধুনিক জীবনের গতিতে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সময় বসে কাটাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, পড়ার টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকে থাকা, অফিসে কম্পিউটারের সামনে কাজ কিংবা অবসরে মোবাইল স্ক্রল করা এখন নিত্যদিনের অভ্যাস। তবে দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকার এই প্রবণতা শরীরের ওপর যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতা এখনও অনেকের নেই। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই অভ্যাস থেকে জন্ম নিতে পারে একটি শারীরিক জটিলতা, যার নাম ডেড বাট সিনড্রোম।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় গ্লুটিয়াল অ্যামনেশিয়া। এর অর্থ হলো নিতম্বের পেশিগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে। অর্থাৎ, শরীরের যে অংশটি হাঁটা, দাঁড়ানো, দৌড়ানো কিংবা ভারসাম্য রক্ষার মতো মৌলিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেটিই ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
মানবদেহের নিতম্বের পেশিগুলো শরীরের অন্যতম শক্তিশালী পেশিগুচ্ছ। এগুলো চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যখন কেউ দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকে, তখন এই পেশিগুলো কার্যত ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নিষ্ক্রিয়তা পেশিগুলোকে দুর্বল করে তোলে। একই সময়ে কোমরের সামনের অংশের পেশিগুলো শক্ত ও ছোট হয়ে যায়। ফলে শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি বিঘ্নিত হয় এবং নিতম্বের পেশির ওপর চাপ আরও কমে আসে। এই অসম ভারসাম্যই ধীরে ধীরে ডেড বাট সিনড্রোমের দিকে ঠেলে দেয়।
এই সমস্যার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর লক্ষণ সরাসরি নিতম্বে সব সময় প্রকাশ পায় না। বরং শরীরের অন্যান্য অংশে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকেই কোমরের নিচের দিকে ব্যথা অনুভব করেন। কারও হাঁটুতে অস্বস্তি বা ব্যথা তৈরি হয়। আবার কেউ কেউ নিতম্বে ঝিনঝিনে অনুভূতি কিংবা দুর্বলতা টের পান। হাঁটার সময় ভারসাম্য ঠিক না থাকা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম করলেও নিতম্বের পেশি সক্রিয় হচ্ছে না বলে মনে হওয়াও এই সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
এর পেছনের কারণ স্পষ্ট। নিতম্বের পেশি যথাযথভাবে কাজ না করলে শরীরের অন্য পেশিগুলো, বিশেষত কোমর ও হাঁটুর পেশি অতিরিক্ত চাপ নিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই বাড়তি চাপ চলতে থাকলে তা ব্যথা ও অস্বস্তির জন্ম দেয়।
এই সমস্যাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি কেবল সাময়িক অস্বস্তির বিষয় নয়। যথাসময়ে সচেতনতা না এলে দীর্ঘমেয়াদি কোমর ব্যথা, হাঁটুর জটিলতা কিংবা চলাফেরার ভঙ্গিতে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত পড়াশোনা বা অফিসের ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তবে আশার বিষয় হলো, কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো এবং কিছুক্ষণ হাঁটা উচিত। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা প্রয়োজন, বিশেষ করে এমন ব্যায়াম যা নিতম্বের পেশিকে সক্রিয় করে। স্কোয়াট, লাঞ্জ, গ্লুট ব্রিজ ও ক্ল্যামশেলের মতো ব্যায়াম উপকারী বলে বিবেচিত। পাশাপাশি কোমর ও হিপ ফ্লেক্সরের স্ট্রেচিং করা দরকার। কাজ বা পড়াশোনার সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি নিয়মিত চলাফেরা ও ব্যায়াম বাড়ানোর পরও ব্যথা বা দুর্বলতা কমে না, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতে প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবুও সামান্য সচেতনতা ও নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া ডেড বাট সিনড্রোমের মতো নীরব সমস্যাকে দূরে রাখতে পারে। শরীরকে সক্রিয় রাখা কেবল আরামদায়ক জীবনের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য।







Add comment