প্রায় ১৩ ঘণ্টা রোজা রেখে শরীরকে সতেজ ও স্থিতিশীল রাখা অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে শর্করার ওঠানামা, পানিশূন্যতা এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তাই সঠিক সাহ্রি নির্বাচন এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অন্যতম প্রধান উপায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিক রোগীর সাহ্রি হওয়া উচিত উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ, উচ্চ আঁশযুক্ত এবং নিম্ন গ্লাইসেমিক সূচকের কার্বোহাইড্রেটভিত্তিক। প্রোটিন দীর্ঘ সময় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। আঁশ বা ফাইবার পানিকে ধরে রাখে এবং ধীরে হজম হয়, ফলে দীর্ঘ সময় সতেজ থাকা যায়। একইভাবে নিম্ন গ্লাইসেমিক সূচকের কার্বোহাইড্রেট ধীরে ধীরে রক্তে শোষিত হয়, যা দিনের বেলায় রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
অনেকে মনে করেন সাহ্রিতে যত বেশি খাওয়া যাবে, তত কম ক্ষুধা লাগবে। তাই অনেকেই অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার গ্রহণ করেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পানি পান করতে থাকেন। তবে এ অভ্যাস সঠিক নয়। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলেও তা সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহৃত হয়ে যায়। বরং বেশি খাওয়ার ফলে অ্যাসিডিটি ও পেটের অস্বস্তিসহ নানা হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সাহ্রিতে স্বাভাবিক ও সুষম খাবার গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা। পরিমিত পরিমাণে ভাতের সঙ্গে মাছ বা মাংস, ডাল, শাকসবজি ও সালাদ রাখা যেতে পারে। খাবারের শেষে এক কাপ দুধ বা দই যুক্ত করলে পুষ্টিগুণ বাড়ে। ইচ্ছা করলে দুধ-ভাতও বিকল্প হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
চালের ক্ষেত্রে সচেতনতা জরুরি। আতপ চালের ভাত এড়িয়ে সেদ্ধ মোটা চাল বা লাল চাল বেছে নেওয়া ভালো, কারণ এদের গ্লাইসেমিক সূচক তুলনামূলক কম। ফলে এগুলো দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। ভাতের পরিবর্তে সমপরিমাণ লাল আটার রুটি বা ওটসও গ্রহণ করা যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন বেশি খেলে শরীরের প্রয়োজন মিটবে। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ কোষে বাড়তি পানির চাহিদা তৈরি করে, যা দিনভর তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিমিত খাবারই উত্তম।
শাকসবজি অবশ্যই সাহ্রির অংশ হওয়া উচিত। এর আঁশ ও সেলুলোজ দীর্ঘ সময় পেটভরা অনুভূতি দেয় এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সাহ্রি শেষ করার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ সময়ের অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে খাবার শেষ করা উচিত। মাঝরাতে সাহ্রি সেরে ফেলা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপযোগী নয়।
বিরিয়ানি, পোলাও বা খিচুড়ির মতো ভারী ও তেলযুক্ত খাবার পরিহার করা উচিত। এ ধরনের খাবার শরীরে পানির চাহিদা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে মাংসের পরিবর্তে মাছ বেছে নেওয়া ভালো, কারণ মাংস হজমে তুলনামূলক বেশি পানি প্রয়োজন হয়। ঘন ডাল রাখা যেতে পারে, যাতে একসঙ্গে আমিষ ও তরল দুটোই পাওয়া যায়।
কেউ কেউ সাহ্রি না খেয়েই রোজা রাখেন, যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। না খেয়ে রোজা রাখলে দিনের বেলায় হাইপোগ্লাইসেমিয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে চোখ ও ত্বকের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্তত একটি খোসাসহ ফল সাহ্রিতে যুক্ত করলে উপকার পাওয়া যায়।
সঠিক পরিকল্পনায় সাজানো সাহ্রি ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য দীর্ঘ রোজার সময় শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাসই এ ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠি।







Add comment