ভালো ঘুমের জন্য ‘ডাচ মেথড’ বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর সতেজ অনুভূতি পাওয়া যায় এবং রাতে ঘুম আসতেও দেরি হয় না। পাশাপাশি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি মানসিক সুস্থতাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মানবদেহের ঘুম ও জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা, যা সার্কাডিয়ান রিদম নামে পরিচিত। এটিকে অনেক সময় জৈবঘড়ি বলা হয়। এই জৈবঘড়ি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থেকে আমাদের ঘুমের সময়সূচি, হরমোন নিঃসরণ, বিপাকক্রিয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দিনের বিভিন্ন সময়ে আমরা কেমন অনুভব করব, তা অনেকাংশে নির্ভর করে এই জৈবঘড়ির ওপর। এমনকি কতক্ষণ ঘুমানো হয়েছে, তার চেয়েও এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনিদ্রায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জৈবঘড়ির ধরন অন্যদের তুলনায় ভিন্ন হয়ে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ডাচ মেথড’ একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো, ঘুমানোর সময় জানালার পর্দা সরিয়ে রাখা, যাতে সকালে প্রাকৃতিক আলো সরাসরি ঘরে প্রবেশ করতে পারে। নেদারল্যান্ডসের অনেক বাড়িতে জানালায় পর্দা না থাকার সংস্কৃতি থেকেই এই পদ্ধতির নামকরণ হয়েছে।
ঘুম বিষয়ক একজন পরামর্শকের মতে, প্রাকৃতিক আলো জৈবঘড়িকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদানগুলোর একটি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় যদি ঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে, তাহলে তা মস্তিষ্ককে দ্রুত সজাগ হওয়ার সংকেত দেয়। এর ফলে দিনের শুরুটা হয় চাঙা ও সক্রিয়। একই সঙ্গে এটি শরীরকে সঠিক সময় ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতিও দেয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের সূর্যালোক জৈবঘড়িকে পুনরায় সমন্বয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে শুধু সকালে সতেজ অনুভূতি পাওয়া যায় না, বরং রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতাও বাড়ে। এই প্রক্রিয়া ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক।
এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক সুস্থতা। একজন মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের মতে, ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে রাখলে শুধু আলো প্রবেশই করে না, বরং বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মানসিক সংযোগও তৈরি হয়। এতে একাকিত্বের অনুভূতি কমে এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
বিশেষ করে শহুরে জীবনে যেখানে একাকিত্ব একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, সেখানে এমন ছোট পরিবর্তনও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জানালার পর্দা সরিয়ে রাখার ফলে ঘরে আলো বৃদ্ধি পায়, যা মনের ওপর ভালো প্রভাব ফেলে, ঘুমের উন্নতি ঘটায় এবং মানসিক কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
এছাড়া এই অভ্যাস প্রতিবেশীদের সঙ্গে এক ধরনের নীরব যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতেও ভূমিকা রাখে। ইউরোপের কিছু দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের আবাসিক এলাকায়, এই ধরনের খোলামেলা পরিবেশ সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে বলে ধারণা করা হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ডাচ মেথড কোনো জটিল পদ্ধতি নয়, বরং একটি সহজ জীবনধারা পরিবর্তন, যা ঘুমের মান উন্নত করার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও বাড়াতে পারে। নিয়মিত এই অভ্যাস অনুসরণ করলে দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করা সম্ভব।





Add comment