আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে–এর পাশেই অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র গ্যালাক্সিতে থাকা এক দানবীয় নক্ষত্রের আচরণ সাম্প্রতিক সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি কাড়ছে। প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরে লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড–এ অবস্থান করা ডব্লিউওএইচ জি৬৪ নামের নক্ষত্রটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করছে, যা গবেষকদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, এই নক্ষত্রটির আকার সূর্যের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫৪০ গুণ বড় এবং ভর প্রায় ৩০ গুণ বেশি। বিশালত্ব ও গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটিকে রেড সুপারজায়ান্ট বা লাল অতিদানব নক্ষত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে আসছিল। সাধারণত এ ধরনের নক্ষত্র জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করলে কেন্দ্রের জ্বালানি নিঃশেষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসারিত ও শীতল হয়ে পড়ে। এই রূপান্তর একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা হাজার হাজার বছর ধরে ঘটে থাকে।
তবে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ডব্লিউওএইচ জি৬৪ প্রত্যাশিত লাল অতিদানবের আচরণ থেকে সরে এসে ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। গবেষকদের মতে, নক্ষত্রটির পৃষ্ঠে শীতল লাল অতিদানবের বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে এবং তার পরিবর্তে উষ্ণ নক্ষত্রের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন ইঙ্গিত করছে যে, নক্ষত্রটি হয়তো ইয়েলো হাইপারজায়ান্ট পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নক্ষত্র বিবর্তনের এই ধাপ অত্যন্ত বিরল এবং স্বল্পস্থায়ী বলে বিবেচিত।
এই আকস্মিক রূপান্তরের পেছনে সম্ভাব্য কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুটি প্রধান ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। প্রথম তত্ত্ব অনুযায়ী, ডব্লিউওএইচ জি৬৪ হয়তো কোনো বিশাল অগ্ন্যুৎপাতের মধ্য দিয়ে তার বাইরের শীতল স্তরগুলো মহাকাশে নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে নক্ষত্রের গভীরে থাকা উত্তপ্ত অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, যা এখন পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ছে। যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে এটি নক্ষত্রটির গঠন ও বিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
দ্বিতীয় তত্ত্বটি সম্ভাব্য সঙ্গী নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে। ধারণা করা হচ্ছে, ডব্লিউওএইচ জি৬৪–এর নিকটবর্তী আরেকটি নক্ষত্র থাকতে পারে, যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দানবীয় এই নক্ষত্রটির বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই মাধ্যাকর্ষণীয় প্রভাবের ফলে নক্ষত্রটির উপাদান ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে এবং এর গঠনগত পরিবর্তন ত্বরান্বিত হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন, তবু সম্ভাবনাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বৃহদাকৃতির নক্ষত্রগুলো তাদের কেন্দ্রের জ্বালানি শেষ করে ফেললে সাধারণত প্রসারিত হয়ে শীতল হয়ে পড়ে এবং লাল অতিদানবে রূপ নেয়। এই বিবর্তন প্রক্রিয়া ধীরগতির এবং দীর্ঘ সময়ব্যাপী। কিন্তু ডব্লিউওএইচ জি৬৪–এর সাম্প্রতিক আচরণ সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করছে। নক্ষত্রটি যদি সত্যিই ইয়েলো হাইপারজায়ান্ট পর্যায়ে প্রবেশ করে থাকে, তবে তা জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশাল আকার, অস্বাভাবিক আচরণ এবং সম্ভাব্য দ্রুত বিবর্তনের ইঙ্গিত মিলিয়ে ডব্লিউওএইচ জি৬৪ এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ এই দানবীয় নক্ষত্রটির রহস্য উন্মোচনে কতটা সহায়ক হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।







Add comment