নতুন প্রকাশিত সরকারি নথিতে উঠে এসেছে, গত বছর টেক্সাসে এক গভীর রাতের যানবাহন তল্লাশি অভিযানের সময় এক মার্কিন নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেন ফেডারেল অভিবাসন সংস্থার একজন কর্মকর্তা। ঘটনাটি এতদিন জনসমক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
২৩ বছর বয়সী ওই তরুণের মৃত্যু দেশব্যাপী অভিবাসন দমন অভিযানের শুরুর পর ফেডারেল কর্মকর্তাদের হাতে সংঘটিত অন্তত ছয়টি প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে প্রাথমিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি মাসে এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানায়, গত মার্চে সাউথ প্যাড্রে আইল্যান্ডে সংঘটিত ওই ঘটনার সময় গাড়ির চালক ইচ্ছাকৃতভাবে এক কর্মকর্তাকে ধাক্কা দিলে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস দলের সদস্যরা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ে একটি অভিবাসন প্রয়োগ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি অলাভজনক নজরদারি সংস্থা তথ্য অধিকার আইনের মামলার মাধ্যমে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের অভ্যন্তরীণ নথির একটি সংকলন সংগ্রহ করে, যেখানে এই ঘটনার বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। নথিগুলো ব্যাপকভাবে সম্পাদিত ছিল।
২০২৫ সালের ১৫ মার্চের ওই ঘটনায় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তরুণের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হলেও এতে ফেডারেল তদন্ত দলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানানো হয়নি। স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানায়, নিহত চালক ইচ্ছাকৃতভাবে এক বিশেষ কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেন এবং অন্য এক কর্মকর্তা আত্মরক্ষার জন্য একাধিক গুলি ছোড়েন। তবে প্রায় ১১ মাস ধরে কেন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব দপ্তর দেয়নি।
নিহতের মা জানান, ছেলের ২৩তম জন্মদিনের কয়েক দিন পরই সে বন্ধুদের সঙ্গে সান আন্তোনিও থেকে সাউথ প্যাড্রে আইল্যান্ডে যায় সপ্তাহান্ত উদযাপন করতে। মার্কিন মেক্সিকো সীমান্তের উত্তরে উপসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত এ স্থানটি বসন্তকালীন অবকাশযাপনের জন্য পরিচিত এবং প্রতিবছর হাজারো তরুণ সেখানে সমবেত হন। তিনি বলেন, তার ছেলে একটি গুদামে কাজ করতেন, ভিডিও গেম খেলতে ভালোবাসতেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। এর আগে কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তার কোনো সমস্যা হয়নি। তার দাবি, ছেলেকে তিনবার গুলি করা হয়েছিল।
আইসিইর দুই পৃষ্ঠার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যরাতের কিছু পর একটি দুর্ঘটনার কারণে ব্যস্ত মোড়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পুলিশকে সহায়তা করছিলেন এইচএসআই কর্মকর্তারা। এ সময় একটি নীল রঙের চার দরজার ফোর্ড গাড়ি ঘটনাস্থলে আসে। কর্মকর্তারা চালককে থামার নির্দেশ দেন, যদিও প্রতিবেদনে থামানোর কারণ উল্লেখ নেই। প্রথমে সাড়া না দিলেও পরে গাড়িটি থামে। এরপর কর্মকর্তারা গাড়িটি ঘিরে ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের বেরিয়ে আসতে বলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চালক হঠাৎ গাড়ি এগিয়ে দেন এবং এক কর্মকর্তাকে ধাক্কা দেন, যিনি গাড়ির বোনেটে উঠে পড়েন। তখন পাশে থাকা এক তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা চালকের পাশের খোলা জানালা দিয়ে একাধিক গুলি ছোড়েন এবং গাড়িটি থেমে যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুত চিকিৎসা দেন এবং চালককে ব্রাউনসভিলের একটি আঞ্চলিক হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। যাত্রী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তাকে আটক করা হয়। আহত কর্মকর্তা হাঁটুর আঘাতের চিকিৎসা নিয়ে ছাড়া পান। জড়িত কর্মকর্তাদের ও গাড়ির আরোহীদের নাম নথিতে গোপন রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, টেক্সাস রেঞ্জার্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্তের দায়িত্ব নেয়। নিহতের মা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ পর তিনি জানতে পারেন তার ছেলেকে স্থানীয় পুলিশ নয়, ফেডারেল কর্মকর্তা গুলি করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক তদন্তকারী তাকে জানান যে এমন ভিডিও ফুটেজ রয়েছে যা ফেডারেল বিবরণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাজ্য জননিরাপত্তা বিভাগ জানায়, তদন্ত এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং এ বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
পরিবারের আইনজীবীরা বলেন, গত এক বছর ধরে তারা জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, কেন একটি সড়ক দুর্ঘটনার স্থানে ফেডারেল অভিবাসন দল উপস্থিত ছিল এবং কেন স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলার সময় এক নাগরিককে গুলি করা হলো, তা পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
আইসিইর প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি সামুদ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তা টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলেন, যা সাধারণত সমুদ্রবন্দরে আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে কাজ করে। তবে গত বছরে একাধিক ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিবাসন প্রয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
এ ধরনের আরেক ঘটনায় জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে এক নারী গাড়ির ভেতর গুলিতে নিহত হন। ওই ঘটনার বর্ণনা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয় এবং ভিডিও ফুটেজ প্রকাশের পর সরকারি বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পুলিশি বলপ্রয়োগ বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন কোনো কর্মকর্তা গাড়ির সামনে অবস্থান নিলেন। এক বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই গাড়ির সামনে দাঁড়ানো উচিত নয়, কারণ চালক পালাতে চাইলে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
নিহতের মা বিশ্বাস করেন না যে তার ছেলে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কর্মকর্তার ক্ষতি করতে চেয়েছিল। তার অভিযোগ, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এবং বিকল্প উপায় অবলম্বন করা যেত।







Add comment