জ্বালানিসংকটে ইভি বাজারে চীনের দাপট

বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তীব্র হওয়ায় বিকল্প পরিবহনের দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো, যার বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠছে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ইভির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি চীনের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রচলন শুরু হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক বাজারে এ খাতে এখন চীন এগিয়ে রয়েছে। দেশটির একটি শীর্ষ কোম্পানি ইতোমধ্যেই মার্কিন উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠিত বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানিকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভি নির্মাতা হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। তুলনামূলক কম দামে গাড়ি সরবরাহ করতে পারার কারণে তারা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে চীনের এই কোম্পানি ২৫ লাখ ৬০ হাজার গাড়ি সরবরাহ করেছে, যা প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে অন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ এ সংখ্যার তুলনায় অনেক কম ছিল। এর ফলে বৈশ্বিক ইভি বাজারে শীর্ষস্থান এখন অনেকটাই এককভাবে ধরে রেখেছে চীনের প্রতিষ্ঠানটি।

শুধু একটি কোম্পানিই নয়, চীনের আরও কয়েকটি বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যেমন জেলি, এসএইআইসি, চাংআন এবং চেরি—সবকটিই বিশ্বের শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে চীনের এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

চীনা ইভির প্রভাব এখন দেশীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই গাড়ির বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলক কম দামের কারণে এসব অঞ্চলে সহজেই বাজার দখল করতে পারছে তারা। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতিতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। অনেক দেশ এখন জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে আগের শুল্ক ও বিধিনিষেধ শিথিল করছে, যা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতারা ক্রমেই চাপে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ ইভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও সরবরাহের দিক থেকে এখন তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। ইউরোপের ভক্সওয়াগন, বিএমডব্লিউ ও স্টেলান্টিস শীর্ষ দশে থাকলেও তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইভি বাজার এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা নয়; এটি পরিণত হয়েছে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতার লড়াইয়ে। এই লড়াইয়ে আপাতত চীনই এগিয়ে। তাদের তৈরি কিছু গাড়ি একবার চার্জে ৪০০ থেকে ৫৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে সক্ষম, যা ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সুবিধা।

জ্বালানিসংকটের কারণে বিভিন্ন দেশে ইভির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে ইভি কেনার জন্য ঋণের আবেদন দ্বিগুণ হয়েছে বলে দেশটির একটি বড় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ইভি কেনার আগ্রহ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

নিউজিল্যান্ডে এক সপ্তাহে এক হাজারের বেশি ইভি নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দেশটির পরিবহন খাতেও এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। দক্ষিণ কোরিয়ায়ও ইভি নিবন্ধন আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর পেছনে জ্বালানির উচ্চমূল্য, প্রতিযোগিতা এবং সরকারি ভর্তুকির ভূমিকা রয়েছে।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই বাড়তি চাহিদা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। দেশীয় বাজারে বিক্রির গতি কিছুটা কমলেও তারা এখন রপ্তানির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চীনে বর্তমানে মোট গাড়ি বিক্রির অর্ধেকের বেশি বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি।

সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে চীনের গাড়ি নির্মাতারা।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed