আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে জাপান ও হাঙ্গেরির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন। জাপানের আগাম সাধারণ নির্বাচনের আগে তিনি দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। একই সঙ্গে হাঙ্গেরির সংসদ নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই সমর্থন শুধু নির্বাচনী প্রভাবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর কূটনৈতিক তাৎপর্যও ব্যাপক।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জাপানের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেকে একজন শক্তিশালী, ক্ষমতাধর ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি প্রকৃত অর্থেই নিজের দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। ট্রাম্পের ভাষায়, এই নেতৃত্ব জাপানের জনগণকে হতাশ করবে না।
সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অন্য দেশের নির্বাচনে সরাসরি কোনো প্রার্থীর পক্ষে কথা বলেন না। তবে ট্রাম্প এই রীতির বাইরে গিয়ে আগেও একাধিক দেশে নির্বাচনী সমর্থন জানিয়েছেন। সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের নির্বাচনে তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা নির্বাচনী ফলাফলেও প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জাপানের ক্ষেত্রে এই সমর্থনের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে টোকিও যখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। শুরুতে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের হুমকি থাকলেও পরে দুই দেশের মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তি হয়। এর ফলে শুল্ক হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন ভারসাম্য পায়।
দলীয় নেতৃত্ব ও সংসদীয় সমর্থনের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসার পর জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নিশ্চিত করতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টের জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সামরিক সম্মাননা, কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা এবং জনসম্মুখে পারস্পরিক প্রশংসা এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।
প্রতিরক্ষা নীতিতেও দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে মিল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায় জাপান নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বেশি বিনিয়োগ করুক, আর জাপানের নেতৃত্বও প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সফরকালে উভয় পক্ষ বিরল খনিজসহ বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে চুক্তি সই করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন এক অধ্যায়ের কথা ঘোষণা করে।
এই সমর্থন কেবল জাপানের ভোটারদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তা নয়। বরং এটি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এবং বিশেষভাবে চীনের প্রতিও একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টোকিও ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাইওয়ান ইস্যুতে জাপানের কঠোর অবস্থান এই টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারেন। তবে নির্বাচনের পর তাঁকে অর্থনৈতিক স্থবিরতা মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন দায়িত্ব নিতে হবে।
একই সময়ে ইউরোপেও ট্রাম্পের সমর্থন আলোচনায় এসেছে। হাঙ্গেরির আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি দেশটির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জানান। অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান ও জাতীয়তাবাদী নীতির কারণে ট্রাম্প এই নেতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি তাঁকে শক্তিশালী ও দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন, যিনি নিজের দেশ ও জনগণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন।
ট্রাম্পের মতে, অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। তাঁর প্রশাসনের সময় হাঙ্গেরি ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল বলেও তিনি দাবি করেন এবং এর কৃতিত্ব দেশটির প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে দেন। অতীতের মতো এবারও সমর্থন জানাতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন বলে উল্লেখ করেন।
হাঙ্গেরির এই নেতা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আসন্ন নির্বাচনে তাঁর দল শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে বলে জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুললেও ট্রাম্প বরাবরই তাঁর নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এই সমর্থন শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক আদর্শিক বিভাজনেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।




Add comment