চোখের পাতা হঠাৎ লাফানো অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর একটি অভিজ্ঞতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ক্ষণস্থায়ী এবং ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটি শরীরের ভেতরে অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই চোখের পাতা লাফানোর সাধারণ কারণগুলো জানা এবং কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
চোখের পাতা লাফানোর সাধারণ কারণ
সবচেয়ে বেশি যে কারণে চোখের পাতা লাফাতে দেখা যায়, তা হলো মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তি। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ বা পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তোলে। যখন শরীর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না, তখন স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে এবং তার প্রতিফলন দেখা যায় চোখের পেশিতে। ফলস্বরূপ চোখের পাতা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে বা লাফাতে শুরু করে।
ডিজিটাল যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এই অতিরিক্ত চাপ থেকে তৈরি হওয়া ডিজিটাল আই স্ট্রেন চোখের পেশিকে ক্লান্ত করে দেয় এবং পাতা লাফানোর মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ক্যাফেইন ও অ্যালকোহলের অতিরিক্ত গ্রহণও এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত বেশি পরিমাণে চা বা কফি পান করলে স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। ক্যাফেইনের প্রভাবে পেশিতে অনিয়ন্ত্রিত স্পন্দন দেখা দিতে পারে, যা চোখের পাতায় লাফানোর আকারে প্রকাশ পায়।
চোখের শুষ্কতাও আরেকটি কারণ। বয়সজনিত পরিবর্তন, দীর্ঘক্ষণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অবস্থান কিংবা পর্যাপ্ত পলক না ফেলার কারণে চোখ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। চোখের আর্দ্রতা কমে গেলে পেশিতে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং পাতা কাঁপার প্রবণতা দেখা দেয়।
পুষ্টির ঘাটতিও এ সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শরীরে ম্যাগনেশিয়াম বা ভিটামিন বি১২–এর অভাব থাকলে পেশিতে খিঁচুনি বা অনিয়মিত স্পন্দন দেখা দিতে পারে। এই ধরনের ঘাটতি চোখের পাতার অনিচ্ছাকৃত লাফানোর কারণ হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
অধিকাংশ ক্ষেত্রে চোখের পাতা লাফানো কয়েক মিনিট থেকে কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যদি পাতা লাফানো টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং বিরতিহীন হয়, তবে তা অবহেলা করা উচিত নয়। আবার যদি চোখের পাতা এতটাই কাঁপতে থাকে যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং খুলতে কষ্ট হয়, সেটিও সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
চোখের পাশাপাশি মুখের অন্যান্য পেশি কাঁপতে শুরু করলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চোখ লাল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত পানি পড়া বা ফুলে ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ
চোখের পাতা লাফানো কমাতে জীবনযাত্রায় কিছু সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে। প্রতিদিন নিয়মিত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক।
ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ কমানোও উপকারী। চা বা কফি অতিরিক্ত না খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে পেশির অস্বাভাবিক স্পন্দন কমতে পারে।
ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সময় সচেতন থাকা জরুরি। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রতি ২০ মিনিট পর পর চোখকে কিছু সময় বিশ্রাম দেওয়া উচিত। এতে চোখের ওপর চাপ কমে এবং পেশি শিথিল থাকে।
চোখে অস্বস্তি অনুভূত হলে পরিষ্কার তোয়ালেতে হালকা গরম পানি নিয়ে সেঁক দেওয়া যেতে পারে। এতে পেশি শিথিল হয় এবং অস্বস্তি কমে আসে।
সচেতনতা ও সঠিক যত্নের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোখের পাতা লাফানো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হবে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।







Add comment