Bp News USA

চার বছরে যুদ্ধের ভারী বোঝা

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের চার বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই সংঘাতে প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে রাশিয়ার ভেতরেও। মস্কো থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত মফস্‌সল শহর ইয়েলেতস তার একটি প্রতীকী উদাহরণ। শীতের সকালে শহরটিকে প্রথম দর্শনে রূপকথার কোনো জনপদ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু কিছু দূর এগোলেই সেই আবহ ভেঙে দেয় বিশাল এক বিলবোর্ড, যেখানে সেনাবাহিনীতে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিলে এককালীন ১৫ হাজার পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে। পাশেই আরেকটি পোস্টারে কালাশনিকভ রাইফেল তাক করা এক সেনার ছবি, স্লোগান লেখা, ‘যেখানে থাকা প্রয়োজন, আমরা সেখানেই আছি।’

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই পূর্ণমাত্রার আক্রমণকে বিশ্বজুড়ে দেখা হয়েছিল কিয়েভকে পুনরায় মস্কোর নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে। পাশাপাশি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোকেও এটি নাড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, এটি হবে স্বল্পমেয়াদি ও সফল সামরিক অভিযান। কিন্তু চার বছর পরও যুদ্ধ থামেনি। বরং এটি নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠেছে।

ইয়েলেতসে যুদ্ধের ক্ষত দৃশ্যমান। শহরের একটি নয়তলা ভবনের দেয়ালে আঁকা হয়েছে পাঁচজন স্থানীয় সেনার মুখাবয়ব, যারা ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। এই দেয়ালচিত্র শুধু স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং শহরের বাস্তবতার প্রতিফলন। যদিও কর্তৃপক্ষ ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এ হতাহতের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না, তবু রণক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আর গোপন নেই।

এই দীর্ঘ সংঘাতের আর্থিক প্রভাবও গভীর। যুদ্ধের খরচ সামাল দিতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার মূল্য সংযোজন কর ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করেছে। অতিরিক্ত রাজস্ব প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এর চাপ সরাসরি এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।

ইয়েলেতসের বাসিন্দারা প্রতিদিন বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা ইরিনা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের নাজেহাল করে তুলেছে। তাঁর ভাষায়, জিনিসপত্রের দাম মানুষকে পিষে ফেলছে, টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও চাপে রয়েছেন। শহরের একটি বেকারির মালিক আনাস্তাসিয়া বাইকোভা বলেন, বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া এবং অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও কর বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ব্যবসায় এসে পড়েছে।

ইয়েলেতস থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে আঞ্চলিক রাজধানী লিপেতস্কেও একই চিত্র। সেখানে এক বাসিন্দা নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দেয়ালের কোণে বরফ জমে আছে, লিফট বিকল, ফুটো পাইপ মেরামতের কেউ নেই। দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধিতেও তিনি বিরক্ত। তাঁর মতে, ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ হয়তো ভালো উদ্যোগ, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে পেনশন বৃদ্ধির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানালেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। চার বছর পেরিয়ে যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করছে। এই দীর্ঘ সংঘাত মানুষের মানসিকতায়ও প্রভাব ফেলেছে। অনেকে মনে করেন, পরিস্থিতি পরিবর্তনের ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। ফলে অনেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, অপেক্ষা করছেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

চার বছর আগে যে অভিযানকে দ্রুত সফলতার প্রত্যাশায় শুরু করা হয়েছিল, তা এখন দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা শহরগুলোতেও তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed