নেদারল্যান্ডসে নীরবে গড়ে উঠেছে চার দিনের কর্মসপ্তাহের এক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বহু প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় কম সময় কাজের মডেল অনুসরণ করছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং ভবিষ্যতে এটি টেকসই থাকবে কি না।
আমস্টারডামের ডে পাইপ এলাকায় অবস্থিত একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা বলেন, সন্তানদের শৈশব একবারই আসে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে কাজে নিমগ্ন রাখেন, কিন্তু পরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারানোর আক্ষেপ তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতা এড়াতেই সাত বছর আগে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে চার দিনের কর্মসপ্তাহে রূপান্তর করেন।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা সপ্তাহে ৩২ ঘণ্টা কাজ করেন, অর্থাৎ প্রতিদিন আট ঘণ্টা। বেতন কমানো হয়নি, চার দিনের মধ্যে অতিরিক্ত সময়ও চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। সহপ্রতিষ্ঠাতার ভাষায়, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য ছিল সিদ্ধান্তের মূল কারণ। তিনি মনে করেন, কম সময় মানেই কম উৎপাদন নয়; বরং কাজের ধরন ও মানসিকতা বদলানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
ডাচ সফটওয়্যার খাতের আরেক প্রতিষ্ঠানের জনবলবিষয়ক প্রধান প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার ছুটি নেন। তার মতে, মানসিক অবকাশ সৃজনশীলতাকে বাড়ায়। প্রতিষ্ঠানটি চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালুর পর অসুস্থতার হার কমেছে এবং কর্মী ধরে রাখার হার বেড়েছে। তবে শুরুতে বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের মধ্যে সংশয় ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন পাঁচ দিনেও কাজ শেষ করা কঠিন, সেখানে চার দিনে কীভাবে সম্ভব। পরবর্তীতে অগ্রাধিকার নির্ধারণে কঠোরতা এবং অপ্রয়োজনীয় বৈঠক কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
নেদারল্যান্ডসে এখন চার দিনের কর্মসপ্তাহ অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত। দেশটির বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন সরকারকে এটি আনুষ্ঠানিক সুপারিশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাছাড়া কর্মীদের আইনি অধিকার রয়েছে কাজের সময় কমানোর আবেদন করার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডাচ কর্মীরা গড়ে সপ্তাহে ৩২ দশমিক ১ ঘণ্টা কাজ করেন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং গড় ৩৬ ঘণ্টার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একই সঙ্গে মাথাপিছু জিডিপি ইউরোপের শীর্ষগুলোর মধ্যে এবং উন্নত অর্থনীতির জোট ওইসিডি সদস্যদের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এতে ধারণা জন্মেছে যে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বজায় রাখা সম্ভব।
তবে ওইসিডির নেদারল্যান্ডস ডেস্কের এক অর্থনীতিবিদের মতে, গত ১৫ বছরে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি স্থবির। জীবনমান ধরে রাখতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে অথবা শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর যোগান বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থাৎ কম সময় কাজের মডেল টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতি কর্মদিবসে বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন জরুরি, নতুবা অভিবাসনের মতো পথ বিবেচনায় আনতে হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসে খণ্ডকালীন কর্মীর হার ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ, প্রায় অর্ধেক কর্মী পূর্ণকালীন কাজ করেন না। মধ্যম আয়ের ক্ষেত্রে উচ্চ করহার অতিরিক্ত সময় কাজের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, ফলে অনেক পরিবার আয় কমিয়ে সময়কে অগ্রাধিকার দেয়। সরকারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চারজন নারীর মধ্যে তিনজন এবং চারজন পুরুষের মধ্যে একজন সপ্তাহে ৩৫ ঘণ্টার কম কাজ করেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর যুক্তি, সপ্তাহে এক দিন কম কাজ করলে শক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং অনেককে শ্রমবাজারে টিকিয়ে রাখা যায়, যারা অন্যথায় কর্মক্ষেত্র ছাড়তে পারেন। তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অবসরপ্রাপ্তের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমছে।
ওইসিডির আরেক অর্থনীতিবিদের মতে, সীমিত কর্মী দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন। শ্রম সরবরাহ বাড়ানোই হবে চাপ কমানোর প্রধান উপায়। নারীদের পূর্ণকালীন কাজে যুক্ত করা একটি সম্ভাব্য পথ, যদিও দেশটিতে নারীদের কর্মসংস্থান হার উচ্চ। তবুও অর্ধেকের বেশি নারী খণ্ডকালীন কাজ করেন, যা ওইসিডি গড়ের প্রায় তিন গুণ। সাশ্রয়ী শিশুযত্ন সুবিধার অভাব এবং জটিল কর ও ভাতা কাঠামো অতিরিক্ত সময় কাজের অনুৎসাহ সৃষ্টি করে।
ডাচ পরিসংখ্যান দপ্তরের এক কর্মকর্তা সমাজে প্রোথিত রক্ষণশীল মানসিকতার কথাও উল্লেখ করেন। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন তিন বছরের কম বয়সী সন্তানের মা সপ্তাহে এক দিনের বেশি কাজ করা উচিত নয়। প্রায় ৮০ শতাংশের মতে, তিন দিনই সর্বোচ্চ সীমা। বাবাদের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৫ শতাংশ ও ২৯ শতাংশ।
শ্রমিক সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, চার দিনের কর্মসপ্তাহ লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে এবং অনুপস্থিতি হ্রাসের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে কর্মী সংকট মোকাবিলায় এ মডেল আকর্ষণীয় সমাধান হতে পারে।
তার ভাষায়, শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই, মানুষ কি আরও সুখী এবং জীবনের উপভোগ বাড়ছে কি না। চার দিনের কর্মসপ্তাহের আলোচনায় সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।







Add comment