তুরস্কের চলচ্চিত্রশিল্পে কর্মরত নারীদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শোষণ ও বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। দেশটির সংবাদ সংস্থা বিয়ানেট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলচ্চিত্র খাতে কাজ করা প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জনই অন্তত একবার কর্মস্থলে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই তথ্য দেওয়া হয়েছে তুরস্কের চলচ্চিত্রকর্মীদের ইউনিয়নের বরাতে।
‘উইমেন ওয়ার্কার্স হেলথ অ্যান্ড অকুপেশনাল সেফটি’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে সিনেমা ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত নারীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে শিল্পের ভেতরে নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কর্মপরিবেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা কর্মজীবনে অন্তত একবার হয়রানি বা শোষণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক সহিংসতা। ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে তুরস্কের চলচ্চিত্রশিল্পে নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহনশীল কর্মপরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, নির্যাতনের ধরন শুধু সরাসরি সহিংসতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অংশগ্রহণকারীদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বেশি জানিয়েছেন, তাঁরা কর্মস্থলে অপমানজনক আচরণ, অবমূল্যায়ন বা ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। পাশাপাশি প্রায় ৬০ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁদের প্রতি কেবল লিঙ্গভিত্তিক কারণে সরাসরি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কাঠামোগত বৈষম্য শিল্পটির বিভিন্ন স্তরে প্রোথিত রয়েছে।
অভিযোগ জানানোর কার্যকর প্রক্রিয়ার অভাবও প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের দুই-তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন, তাঁদের কর্মস্থলে হয়রানি বা শোষণের অভিযোগ জানাতে কোনো কার্যকর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ তুলতে সাহস পান না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই শিল্পে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি ও অনানুষ্ঠানিক নিয়োগব্যবস্থা প্রচলিত থাকায় অনেক নারী প্রতিশোধ, কালোতালিকাভুক্ত হওয়া কিংবা ভবিষ্যতে কাজ হারানোর আশঙ্কায় নীরব থাকতে বাধ্য হন।
শারীরিক নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জানিয়েছেন, পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ, শৌচাগার কিংবা শুটিং লোকেশনে যাতায়াতের সময় তাঁরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং, দুর্গম বা অপ্রতুল অবকাঠামোর লোকেশন এবং গভীর রাতে যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত দুই দশকে তুরস্কের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তার লাভ করেছে। দেশটির নির্মিত কনটেন্ট আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে রপ্তানি হচ্ছে এবং বৈশ্বিক দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তবে শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, শিল্পটির দ্রুত সম্প্রসারণের তুলনায় শ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দুর্বল এবং কর্মপরিবেশ তদারকিতে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব রয়েছে। শ্রম আইন প্রয়োগেও দেখা যাচ্ছে অসামঞ্জস্যতা।
প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া নারীরা কর্মস্থলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও যৌথ দর কষাকষির অধিকার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং কাঠামোগত ও গভীরভাবে প্রোথিত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের মাধ্যমে। শিল্পের বিস্তার ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।







Add comment