চকলেট গলে যাওয়ায় জন্ম মাইক্রোওয়েভ ওভেন

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে দ্রুত রান্না ও খাবার গরম করার ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভ ওভেন এখন এক অপরিহার্য যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাবার সহজে প্রস্তুত করা কিংবা সংরক্ষিত খাবার মুহূর্তেই গরম করে খাওয়ার সুবিধা এনে দিয়েছে এই প্রযুক্তি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই যন্ত্রটির আবিষ্কার হয়েছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক এক ঘটনার মাধ্যমে। এক রাডার প্রকৌশলীর পকেটে থাকা চকলেট হঠাৎ গলে যাওয়ার ঘটনাই পরবর্তীতে মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরির পথ খুলে দেয়।

মাইক্রোওয়েভ ওভেনের আবিষ্কারক ছিলেন এক মার্কিন রাডার প্রকৌশলী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ খুব বেশি না থাকলেও নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাডার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল রাডার প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ম্যাগনেট্রন টিউব উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজ করা এবং এর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো।

১৯৪৫ সালে একটি সক্রিয় ম্যাগনেট্রন টিউব পরীক্ষা করার সময় ঘটে অদ্ভুত একটি ঘটনা। পরীক্ষার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁর পকেটে রাখা একটি চকলেটবার গলে গেছে। বিষয়টি প্রথমে অবাক করলেও পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। ধারণা করতে থাকেন, ম্যাগনেট্রনের তৈরি তরঙ্গের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে কি না।

ঘটনাটি যাচাই করার জন্য তিনি একটি নতুন পরীক্ষা করেন। ম্যাগনেট্রনের কাছাকাছি কিছু পপকর্নের দানা রেখে দেখেন কী ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেগুলো ফুটতে শুরু করে। এই ফলাফল দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে ম্যাগনেট্রন থেকে নির্গত মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ খাবার গরম করতে সক্ষম। এরপর তিনি ডিম ব্যবহার করে আরেকটি পরীক্ষা চালান। পরীক্ষার সময় ডিমের খোলস ফেটে যায়, যা তাঁকে আরও নিশ্চিত করে যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাবার রান্না করা সম্ভব। এভাবেই নতুন ধরনের রান্না প্রযুক্তির সম্ভাবনা সামনে আসে।

এই আবিষ্কারের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালেই মাইক্রোওয়েভ রান্না প্রযুক্তির জন্য পেটেন্ট আবেদন করে। পরবর্তীতে গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রে রূপ দেওয়ার কাজ শুরু হয়।

এর দুই বছর পর, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বাণিজ্যিক মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে আনে। এর নাম দেওয়া হয় “রাডারেঞ্জ”। তবে সেই সময়ের মাইক্রোওয়েভ ওভেন আজকের মতো ছোট বা সহজ ব্যবহারযোগ্য ছিল না। এটি প্রায় ছয় ফুট লম্বা ছিল এবং ওজন ছিল প্রায় ৭৫০ পাউন্ড। পাশাপাশি এর দামও ছিল অত্যন্ত বেশি, প্রায় পাঁচ হাজার ডলার। বর্তমান সময়ের হিসাব অনুযায়ী যার মূল্য প্রায় ৭৩ হাজার ডলারের সমান।

এত বড় আকার ও উচ্চমূল্যের কারণে প্রথম দিকে এই যন্ত্র সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি। মূলত সামরিক বাহিনী বা হাসপাতালের রান্নাঘরেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এর আকার ছোট হতে থাকে এবং ব্যবহার সহজ হয়।

১৯৫৫ সালে একটি মার্কিন গৃহস্থালি যন্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিবারের ব্যবহারের জন্য উপযোগী মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে আনে। তবে তখনো এর দাম বেশ বেশি থাকায় সেটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।

মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ব্যাপক বিস্তার শুরু হয় মূলত ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকে। সে সময় জাপানের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম খরচে ম্যাগনেট্রন উৎপাদন শুরু করে। এর ফলে মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরির খরচ কমে আসে এবং ধীরে ধীরে এর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছে যায়।

১৯৬৭ সালে একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান প্রথম কমপ্যাক্ট কাউন্টারটপ মডেলের মাইক্রোওয়েভ ওভেন বাজারে আনে। এই মডেলের দাম ছিল প্রায় ৪৯৫ ডলার। আকারে ছোট এবং ব্যবহার সহজ হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এরপর প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে মাইক্রোওয়েভ ওভেন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী গ্যাস চুলার তুলনায় মাইক্রোওয়েভ ওভেনের বিক্রি বেশি হয়ে গেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক পরিবারেই এই যন্ত্র ব্যবহার শুরু হয়।

এভাবেই এক সাধারণ পরীক্ষার সময় ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা থেকে জন্ম নেয় আধুনিক রান্নাঘরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যা আজ সারা বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed