বিশ্বের শীর্ষ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাজার মূলধনে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। টানা এক বছর ধরে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার ফলেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। গত এক বছরে ওয়ালমার্টের শেয়ারমূল্য মোট ২৬ শতাংশ বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন। এই উত্থানের মাধ্যমে ওয়ালমার্ট এখন এনভিডিয়া ও অ্যালফাবেটের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানির কাতারে জায়গা করে নিয়েছে।
খুচরা বিক্রয় খাতে ওয়ালমার্টের এই সাফল্য বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে দুই ভিন্ন আয়ের গ্রাহকগোষ্ঠীকে ধরে রাখতে পেরেছে। একদিকে উচ্চ আয়ের ক্রেতাদের আকর্ষণ করেছে, অন্যদিকে তাদের দীর্ঘদিনের মূল গ্রাহক নিম্ন আয়ের মানুষেরাও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এই দ্বিমুখী কৌশলই গত এক দশকে ওয়ালমার্টের শেয়ারমূল্য ৪৬৮ শতাংশ বাড়াতে সহায়তা করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বেড়েছে ২৬৪ শতাংশ। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক প্রতিষ্ঠান এই ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোতেও ওয়ালমার্ট বড় ভূমিকা রেখেছে। গত পাঁচ বছরে তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া পণ্যের সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়েছে। দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে এক ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবা। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চালু হয়েছে ওয়ালমার্ট প্লাস সাবস্ক্রিপশন পরিষেবা। শুধু খুচরা বিক্রয়েই নয়, বিজ্ঞাপন ব্যবসাতেও প্রবেশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকে আয় এখন ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি, যা কোম্পানির সামগ্রিক মুনাফা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ওয়ালমার্টের আরেকটি বড় শক্তি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগাম বিনিয়োগ। সরবরাহব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় করতে তারা কয়েক শ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এর ফলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে গতি এসেছে। পণ্যের মজুত ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হয়েছে এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য অনুসন্ধান ও সরবরাহ সহজ হয়েছে। এই ব্যবস্থাপনাগত উন্নতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের মতো বিশ্লেষক সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়েও টানা প্রায় চার বছর ভালো ফল করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ছে, যা কোভিড মহামারির সময় থেকে আরও জোরদার হয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ওয়ালমার্ট দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়ালমার্টের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। দেশটিতে যত মুদিপণ্য কেনাবেচা হয়, প্রতি চার ডলারের এক ডলারই আসে ওয়ালমার্ট থেকে। তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করার কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় হ্রাস বা শ্রমবাজারে মন্দার মতো পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
এক বিনিয়োগকারী মন্তব্য করেছেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধন অর্জন সত্যিই ব্যতিক্রমী ঘটনা। এত দিন এই অর্জন মূলত প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন খুচরা বিক্রয় খাতের একটি প্রতিষ্ঠান সেই তালিকায় যুক্ত হলো। খরচ কমাতে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার কৌশলও তিনি প্রশংসা করেছেন।
১ ফেব্রুয়ারি থেকে দায়িত্ব নেওয়া বৈশ্বিক প্রধান নির্বাহীর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তি বিনিয়োগের গতি আরও বাড়ানো। পাশাপাশি অ্যামাজন, আলডি ও কস্টকোর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা।
ওয়ালমার্ট ইতিমধ্যে ওপেনএআই ও গুগলের সঙ্গে অংশীদারত্বে গেছে। এর ফলে সার্চ চ্যাটবটে ওয়ালমার্টের ওয়েবসাইটের লিংক যুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যামাজন আগেই পথ দেখিয়েছে। ওয়ালমার্ট এখন সেই ব্যবধান কমাতে কাজ করছে। খুচরা বিক্রয় জগতে খাদ্য বিক্রিই তাদের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। এক মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তার মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ওয়ালমার্টের বাজার মূলধন দুই ট্রিলিয়ন বা দুই লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।







Add comment