অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগজনিত সমস্যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অকারণ ভয় এবং বারবার অস্থিরতা, এসব লক্ষণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘পুষ্টিগত মনোবিজ্ঞান’ নামে একটি গবেষণাধারা গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক খাদ্য নির্বাচন মানসিক সুস্থতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে সহায়তা করে, যা মানুষের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং উদ্বেগ কমাতে ভূমিকা রাখে। এজন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, বাদাম ও ছোলার মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবারও অ্যাংজাইটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যেসব প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিদিন ২৫ গ্রামের বেশি আঁশ গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে উদ্বেগের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কম দেখা যায়। আঁশ হজমশক্তি উন্নত করে এবং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা গাট হেলথ ভালো রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক। ফল, শাকসবজি, ডাল ও আস্ত শস্য ফাইবারের ভালো উৎস হিসেবে বিবেচিত।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এবং ভিটামিন সি মানসিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন বি৫, বি৬ ও ফলিক অ্যাসিড মস্তিষ্কে হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই ভিটামিনগুলো পেতে খাদ্যতালিকায় মাংস, দুধ, ডিম, গাঢ় রঙের শাকসবজি, গোটা শস্য ও বাদাম রাখা প্রয়োজন।
ভিটামিন সি মস্তিষ্কের কোষ পুনর্গঠন এবং হতাশা দূরীকরণে সহায়ক। সাইট্রাস ফল, বেরি এবং ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলির মতো ক্রুসিফেরাস সবজি ভিটামিন সি–এর সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে পরিচিত।
তবে কিছু খাবার রয়েছে, যা অ্যাংজাইটি বাড়িয়ে দিতে পারে। উচ্চমাত্রার চিনি ও কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে গবেষণায় দেখা গেছে। এসব খাবারের গ্লাইসেমিক সূচক বেশি হওয়ায় রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ক্যান্ডি, সোডা এবং মিষ্টিযুক্ত পানীয় এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোলেস্টেরল, ট্রান্সফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার যেমন লাল মাংস, মাখন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও বাণিজ্যিক বেকড পণ্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে পারে। দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণ করলে নিউরোপ্লাস্টিসিটি কমে যেতে পারে, যা মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি এবং বার্ধক্য ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখে।
তবে সব ধরনের চর্বি ক্ষতিকর নয়। ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। ইপিএ ও ডিএইচএ সাধারণত মাছ ও সামুদ্রিক খাবারে পাওয়া যায়, আর এএলএ পাওয়া যায় উদ্ভিজ্জ উৎসে। এসব উপাদান প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
এছাড়া অসম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার যেমন ডিম, বাদাম, বীজ, জলপাই, তেল, অ্যাভোকাডো ও সামুদ্রিক মাছও উদ্বেগ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং ক্ষতিকর খাদ্য এড়িয়ে চলার মাধ্যমে উদ্বেগ কমানো সম্ভব হতে পারে।





Add comment