Bp News USA

কান পরিষ্কারে ভুলেই বাড়ছে ঝুঁকি

দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হিসেবে অনেকেই হাতের কাছে যা পান, তাই দিয়ে কান পরিষ্কার করতে শুরু করেন। কটন বাড, দেশলাইয়ের কাঠি, বব পিন কিংবা অনুরূপ কোনো সরু বস্তু কানের ভেতরে ঢুকিয়ে ময়লা বের করার চেষ্টা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশিরভাগ মানুষের বিশ্বাস, এভাবেই কানের সব ময়লা পরিষ্কার হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদে তা কানের জন্য ক্ষতিকর।

বিশ্বব্যাপী কটন বাড বা কটন সোয়াবের বাজারের পরিসংখ্যানই এই অভ্যাসের ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৪ সালে এ পণ্যের বাজারমূল্য ছিল ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮২৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিবছরই এর বিক্রি বাড়ছে। অথচ নাক কান গলা বিশেষজ্ঞদের মতে, কানের ভেতরে কটন বাড বা এ ধরনের কিছু প্রবেশ করানো কানের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর একটি।

সমস্যার মূল কারণ আমাদের বোঝাপড়ায়। আমরা কান পরিষ্কার বলতে যা বুঝি, চিকিৎসাবিজ্ঞান তার সঙ্গে একমত নয়। সাধারণ ধারণা হলো, কানের ভেতরে জমে থাকা ময়লা নিয়মিত বের করে ফেলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে মানবকান নিজেই একটি স্বয়ংক্রিয় সেলফ ক্লিনিং ব্যবস্থা।

কানের ভেতরে সিলিয়া নামে অতি ক্ষুদ্র লোম থাকে। পাশাপাশি সেখানে থাকে ইয়ার ওয়াক্স বা সেরুমেন, যা সাধারণভাবে কানের খইল নামে পরিচিত। অনেকেই এটিকে ময়লা মনে করে দ্রুত সরিয়ে ফেলতে চান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, কানের খইল থাকা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। এটি কানের ভেতর আর্দ্রতা বজায় রাখে, বাইরের ধুলাবালি ও জীবাণু আটকে দেয় এবং সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

সিলিয়া নামের ক্ষুদ্র লোমগুলো ক্রমাগত নড়াচড়া করে কানের গভীর অংশ থেকে মোম ও ময়লাকে ধীরে ধীরে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ কান নিজেই নিজের ভেতর পরিষ্কার রাখার কাজ সম্পন্ন করে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

কিন্তু যখন কেউ কটন বাড বা অন্য কোনো বস্তু কানে প্রবেশ করান, তখন পরিস্থিতি উল্টো হয়ে যায়। এতে ময়লা বাইরে না এসে বরং আরও ভেতরের দিকে ঠেলে যায়। সেখানে সিলিয়ার নাগাল থাকে না, ফলে প্রাকৃতিকভাবে তা আর বের হতে পারে না। বারবার খোঁচানোর ফলে নরম মোম ভেতরে জমাট বেঁধে শক্ত আকার ধারণ করতে পারে। তখন তা অপসারণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কানের পর্দার ঝুঁকি। সামান্য অসাবধানতাতেই কটন বাড কানের পর্দায় আঘাত করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে পর্দা ফেটে যেতে পারে, যা স্থায়ী শ্রবণক্ষমতা হ্রাসের কারণ হতে পারে।

নিরাপদ উপায়ে কান পরিষ্কারের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদ্ধতির কথা বলেন। প্রথমত, কানের বাইরের অংশ পরিষ্কার রাখাই যথেষ্ট। গোসলের সময় নরম তোয়ালে বা কাপড় হালকা গরম পানি ও সাবান দিয়ে ভিজিয়ে কানের বাইরের ভাঁজ এবং পেছনের অংশ মুছে নেওয়া যায়। কানের ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয়ত, যাঁদের কানে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মোম জমে, তাঁরা কটন বাডের পরিবর্তে কটন বল বা সাধারণ তুলা ব্যবহার করতে পারেন। তুলা হালকা গরম পানি, স্যালাইন ওয়াটার বা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডে ভিজিয়ে মাথা একপাশে কাত করে কয়েক ফোঁটা তরল কানে দেওয়া যায়। তবে তুলা কানের ভেতরে প্রবেশ করানো যাবে না। এক মিনিট পর মাথা বিপরীত দিকে কাত করলে তরলের সঙ্গে নরম হওয়া ময়লা বেরিয়ে আসতে পারে। এরপর বাইরের অংশ টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না করাই শ্রেয়, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। কানের পর্দায় সমস্যা থাকলে এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলতে হবে।

তৃতীয়ত, ফার্মেসিতে পাওয়া যায় এমন ইয়ার ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে সাধারণত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থাকে। এগুলো শক্ত মোম নরম করতে সহায়তা করে।

এছাড়া যারা নিয়মিত ইয়ারবাড ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ময়লা জমার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এ কারণে কানের ওপর দিয়ে পরা যায় এমন হেডফোন ব্যবহার করলে বাতাস চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং মোম কম জমে।

সবশেষে, কানে ব্যথা, স্থায়ী চুলকানি বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে চিকিৎসা না করে সরাসরি নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে নিরাপদে জমে থাকা ময়লা অপসারণ করা সম্ভব।

কানের যত্ন নিতে গিয়ে ভুল অভ্যাস যেন বড় ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। প্রকৃতিগতভাবে কান নিজেই নিজের সুরক্ষা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা বহন করে, তাই অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপই অনেক সময় বিপদের সূত্রপাত ঘটায়।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed