যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ক্ল্যাক্সটন এলাকার আকাশে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যেত। ‘বুল রান ফসিল’ প্ল্যান্টের সেই দুটি বিশাল চিমনি এখন অতীতের অংশ। স্থাপনাটি ভেঙে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের এক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা জ্বালানি প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তার অর্থায়নে পরিচালিত টাইপ ওয়ান এনার্জি নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে নির্মাণ করছে একটি ফিউশন রিঅ্যাক্টর, যাকে বিজ্ঞানীরা অভিহিত করছেন কৃত্রিম সূর্য হিসেবে।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি টেনেসি ভ্যালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ইনফিনিটি ওয়ান’ প্রকল্পের লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা দেয়। অনুমোদন মিললে এটি হবে টেনেসি অঙ্গরাজ্যের প্রথম বাণিজ্যিক ফিউশনভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফিশন পদ্ধতিতে ভারী পরমাণুকে ভেঙে শক্তি উৎপাদন করা হয়। কিন্তু ফিউশন প্রযুক্তি সেই প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে হালকা পরমাণুকে একত্রিত বা ফিউজ করে বিপুল শক্তি তৈরি করা হয়, যেমনটি সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রে ঘটে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ঝুঁকি ফিশনের তুলনায় অনেক কম বলে বিবেচিত।
ইনফিনিটি ওয়ান রিঅ্যাক্টরটি একটি বিশেষ নকশার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হচ্ছে, যার নাম স্টেলারটর। বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত অধিকাংশ ফিউশন রিঅ্যাক্টর টোমাকাক মডেলের, যা ডোনাট আকৃতির। তুলনামূলকভাবে স্টেলারটরের নকশা অনেক বেশি জটিল ও প্যাঁচানো। এই প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন প্লাজমাকে প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এ তাপমাত্রা সূর্যের কেন্দ্রের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি। এমন উচ্চতাপমাত্রার প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যবহার করা হয় অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক কয়েল। টোমাকাক রিঅ্যাক্টরে প্লাজমার স্থায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে স্টেলারটরের জটিল প্যাঁচানো কাঠামো প্লাজমাকে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় স্থির রাখতে সক্ষম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ফিউশন শক্তিকে প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হয় না। ২০২৩ সালে মার্কিন নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, ফিউশন রিঅ্যাক্টরকে প্রচলিত পারমাণবিক কেন্দ্রের কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তে কণা ত্বরক যন্ত্রের মতো বিবেচনা করা হবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রযুক্তিটির গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে ইনফিনিটি ওয়ান রিঅ্যাক্টরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে ৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘ইনফিনিটি টু’ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
দীর্ঘদিনের কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জায়গায় ফিউশনভিত্তিক প্রযুক্তির স্থাপনা শুধু অবকাঠামোগত পরিবর্তনই নয়, জ্বালানি নীতিতেও বড় ধরনের রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে। কৃত্রিম সূর্যের ধারণা বাস্তবায়িত হলে তা ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।







Add comment