১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত গণহত্যাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবটিতে সে সময়কার ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত শুক্রবার প্রতিনিধি পরিষদের এক সদস্য এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন এবং পরবর্তী পর্যালোচনার জন্য এটি বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান, যা বর্তমান বাংলাদেশ, অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল এবং সেখানকার শাসকগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিজেদের অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখে। বিভিন্ন নথিতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে বাঙালিদের প্রতি গভীর বৈষম্যমূলক মনোভাব বিদ্যমান ছিল এবং তাঁদেরকে নিম্নমানের জাতিগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো।
১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে সরকার গঠন নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট, একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা এবং নির্বাচিত নেতার মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নির্বাচিত নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একটি দমন অভিযান শুরু করে।
এই অভিযানের সময় বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী এটি কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে ধারণা করা হয়, যদিও সামাজিক বাস্তবতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব হবে না।
সে সময়ের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণেও এই নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত কলামে এক সাংবাদিক উল্লেখ করেন, ২৫ মার্চ রাতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছে হত্যার জন্য নির্ধারিত ব্যক্তিদের তালিকা ছিল। একই সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় এই ঘটনাকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বাঙালি ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত হামলার কথা তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে একই কূটনীতিক মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান, যা ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত। ওই বার্তায় স্বাক্ষরকারী কূটনীতিকরা উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি গণহত্যার সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের একটি উপকমিটির চেয়ারম্যান তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত সন্ত্রাস ও গণহত্যার প্রমাণ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুসংগঠিত। এতে বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হত্যা, লুটপাট এবং নিপীড়নের ঘটনা তুলে ধরা হয়।
এছাড়া একটি আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক সংস্থার গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হিন্দুদের হত্যা এবং তাদের গ্রাম ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। জাতিসংঘের গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, কোনো জাতিগত, ধর্মীয় বা নৃগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডই গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রস্তাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং স্মরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যাতে ভুক্তভোগীদের স্মৃতি রক্ষা করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে এতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের নৃশংসতার নিন্দা, বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হত্যাযজ্ঞের স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবটিতে আরও বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা উচিত নয়। পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।





Add comment