ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারে নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি সৌদি আরবের যুবরাজকে হোয়াইট হাউসে যে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তা তাঁর বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সফরটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ রুটিন সফর বলা হলেও বাস্তবে এটি ছিল বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন বিশ্বকে দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে কাকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে আয়োজিত অভ্যর্থনার দৃশ্য ছিল নজরকাড়া। সেখানে ঘোড়সওয়ার ইউনিফর্মধারী সেনারা পতাকা হাতে রাজকীয় সৌন্দর্য যোগ করেন এবং এরই সঙ্গে আকাশজুড়ে দেখা যায় যুদ্ধবিমানের শোভাযাত্রা। নবসজ্জিত সোনালি ছোঁয়ায় গড়া ওভাল অফিসে প্রবেশের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত দেখা যায়। তিনি যুবরাজের হাত ধরে কয়েকবার বলেন, দুই দেশের মধ্যকার রাজকীয় বন্ধুত্ব তাঁর কাছে বিশেষ সম্মানের।

তবে এই উজ্জ্বল মুহূর্তে ছেদ পড়ে যখন একজন সাংবাদিক অবতারণা করেন ২০১৮ সালে এক সাংবাদিককে হত্যা ও দেহচ্ছেদের প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মুহূর্তেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করেন এবং দাবি করেন যে নিহত ব্যক্তি ছিলেন অত্যন্ত বিতর্কিত। সেই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সৌদি যুবরাজ কিছুই জানতেন না। তাঁর এ দাবি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের পুরো বিপরীত।

মানবাধিকার উপেক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করা এবং স্বৈরশাসক নেতাদের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন বৈশিষ্ট্য নয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর পররাষ্ট্রনীতি দ্রুত পাল্টে গেছে। তবে সৌদি যুবরাজের সাম্প্রতিক সফর ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক আকাশে বিশেষ পরিবর্তনের সংকেত দিয়েছে।

এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে, সৌদি আরবের কাছে এফ থার্টিফাইভ জঙ্গিবিমান বিক্রি করা হবে এবং তা কোনো শর্ত ছাড়াই। শুধু তাই নয়, সৌদির জন্য বরাদ্দ জেটগুলোর প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হবে একেবারে সেই মানের, যা বর্তমানে ইসরায়েলের হাতে থাকা জঙ্গিবিমানগুলোতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সুবিধার ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু এবার সেই নীতিকেই উপেক্ষা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতে, সৌদি আরব এবং ইসরায়েল উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং উভয় দেশই সেরা সামরিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। এই মন্তব্য ইসরায়েলের কাছে অস্বস্তিকর এবং তা দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনার আরেকটি স্তর যুক্ত করেছে।

এফ থার্টিফাইভ বিক্রির পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণাও এসেছে। সৌদি আরব যে নিজেকে বৈশ্বিক প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, এই সিদ্ধান্ত সেই পথকে আরও উন্মুক্ত করেছে। বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং এআই অর্থনীতিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে এগোতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক অতিথি গবেষক মন্তব্য করেছেন, এআই খাতে মার্কিন সৌদি অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কে তেলের যুগের মতোই স্থায়ী ও গভীর ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি আরও কিছু ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন হয়তো সাময়িকভাবে হলেও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রতি অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, তাতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য পথকে খোলা রাখা হয়েছে। ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও সেই ভাষা বাদ যায়নি। কয়েক মাস আগে সিরিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও একই দিক নির্দেশ করে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেলেও ইসরায়েলে যাননি।

সমগ্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এমন এক কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে সৌদি আরবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের অবিচল নীতি হিসেবে ইসরায়েলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রচলন স্পষ্টভাবে নড়বড়ে হয়ে উঠছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed