যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের কাছে স্পর্শকাতর সরকারি তথ্য পাচারের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে সাবেক এক শীর্ষ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়েছে। সরকারি কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগে এই তদন্ত পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশ। বিষয়টি ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
তদন্তের আওতায় থাকা এই রাজনীতিক একসময় ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দায়িত্বে থাকার সময় সরকারি নথি ও সংবেদনশীল তথ্য এপস্টেইনের কাছে পাঠিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত ই–মেইল নথিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকাশিত নথিগুলোতে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ২০০৯ সালে তৎকালীন লেবার সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ওই ই–মেইলগুলো পাঠান। সেই সময় বিশ্ব অর্থনীতি ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে বাজারসংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য পাচারের অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে বিবিসি তাঁর বক্তব্য জানার চেষ্টা করলেও সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিনি দাবি করছেন যে কোনো অপরাধমূলক কাজ তিনি করেননি এবং ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে কিছু করেননি।
এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তে পুলিশের প্রয়োজন হলে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। সরকারি এক মুখপাত্র জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করাই সরকারের নীতিগত অবস্থান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনি সংসদের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন। সংসদীয় কর্তৃপক্ষকে তিনি বিষয়টি অবহিত করেছেন।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। গত সোমবার স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি ও রিফর্ম ইউকে যৌথভাবে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে বিষয়টি জানায়। পরদিন সরকার জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া ই–মেইল নথিগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব ই–মেইল বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাঠানো হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, নথিগুলোর প্রাথমিক পর্যালোচনায় ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট সংশ্লিষ্ট বাজারসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। বিষয়টি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় তদন্তকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানান, তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে ওই মন্ত্রীর যোগাযোগ–সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কাছে পাঠিয়েছেন। এর আগে তিনি কেবিনেট সেক্রেটারিকেও চিঠি দিয়েছিলেন, যা ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে থাকা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ ছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অভিযোগ সত্য হলে তা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর পক্ষে কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওই সময় পুরো সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা মোকাবিলায় ব্যস্ত ছিল।
মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে ৭২ বছর বয়সী এক সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট যেকোনো তথ্য মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ।
এদিকে, সপ্তাহান্তে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী আবারও এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন এবং ভুক্তভোগী নারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। যদিও তিনি হাউস অব লর্ডস ছাড়লে আর সংসদ সদস্য থাকবেন না, তবু তাঁর লর্ড উপাধি বহাল থাকবে। আইন অনুযায়ী, এই উপাধি বাতিল করতে হলে পার্লামেন্টে আলাদা আইন পাস করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব ওই উপাধি বাতিলের লক্ষ্যে একটি আইনের খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার।







Add comment