গাজার আল রাজি স্কুলে ইসরায়েলি হামলার সেই দিনটি চিরতরে বদলে দেয় ১২ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কিশোর আবদুর রহমান আল নাশাশের জীবন। ওই হামলায় সে তার বাবাকে হারায়। একই সঙ্গে ভয়াবহভাবে আহত হয়ে নিজের একটি পা হারাতে হয় তাকে। মুহূর্তের মধ্যে একটি শিশুর স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে। চিকিৎসা শেষে তার ঠাঁই হয় মধ্য গাজার অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ডেইর আল বালাহর বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে। এখানেই এখন তার দিন কাটে, আর তার নীরব সঙ্গী হয়ে উঠেছে একটি ওদ, মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র।
বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে সকাল ও বিকেলের নির্দিষ্ট সময় নেই। চারপাশে ধ্বংস, উৎখাত আর অনিশ্চয়তার মাঝেই ছোট্ট হাতে ওদ তুলে নেয় আবদুর রহমান। তার বাজানো করুণ সুর যেন নিজের জীবনের কথাই বলে। বাবা হারানোর বেদনা, শারীরিক অক্ষমতা আর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা সব মিলিয়ে সেই সুর হয়ে ওঠে গভীর কষ্টের ভাষা।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি ইনস্টাগ্রামে আবদুর রহমানের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। ছবিগুলোতে তাকে বন্ধুদের সঙ্গে বসে ওদ বাজাতে দেখা যায়। চোখে মুখে ক্লান্তি থাকলেও সুরে ধরা পড়ে অদম্য মনোবল। জানা যায়, ছোটবেলায় বাবাই তাকে প্রথম ওদ উপহার দিয়েছিলেন। বাবার তত্ত্বাবধানে সে সংগীত শেখা শুরু করে। তখন সংগীত ছিল আনন্দের অংশ, খেলাধুলার মতোই স্বাভাবিক এক অভ্যাস। কিন্তু আল রাজি স্কুলে হামলার পর সবকিছু পাল্টে যায়। বাবাকে হারিয়ে সে হয়ে পড়ে নির্বাক। তার নিরাপদ শৈশব আর রঙিন পৃথিবী মুহূর্তে অন্ধকারে ঢেকে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় আবদুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য জর্ডানে নেওয়া হয়। সেখানে তার কাটা পায়ের জায়গায় কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পুরো সময়জুড়ে তার সঙ্গে ছিল বাবার দেওয়া প্রিয় ওদ। সেই ওদই ছিল তার মানসিক শক্তির একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু গাজায় ফেরার পথে সেই ওদ সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি পায়নি সে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাদ্যযন্ত্রটি রেখে ফিরতে হয় তাকে। এই ঘটনাটি তাকে আবারও মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
গাজায় ফিরে বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর তার সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা নজরে পড়ে শিবিরের এক শিক্ষকের। সেই শিক্ষক নিজের উদ্যোগে আবদুর রহমানকে একটি নতুন ওদ উপহার দেন। নতুন করে আবার সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয় সে। যুদ্ধ, অবরোধ আর প্রতিদিনের দুর্দশার মাঝেও তার ওদের সুর হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার এক নীরব প্রতিবাদ। কথা বলার শক্তি যেখানে ফুরিয়ে আসে, সেখানে সুরই হয়ে ওঠে তার অনুভূতির ভাষা।
বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবার বসবাস করছে। তাদের বড় একটি অংশই বাস্তুচ্যুত এবং চরম মানবিক সংকটে দিন পার করছে। দীর্ঘ অবরোধ ও ধারাবাহিক হামলার কারণে শিবিরটির জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ঘাটতি নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই পরিবেশেই বড় হচ্ছে আবদুর রহমানের মতো অসংখ্য শিশু, যারা শৈশবের আগেই যুদ্ধের নির্মমতা দেখেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজা এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই সময়ে ইসরায়েলি তাণ্ডবে ৭১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ। গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর মধ্যেই আবদুর রহমানের মতো শিশুরা সুর, স্মৃতি আর অদম্য মনোবলের ভর করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।






Add comment