মঙ্গল গ্রহে মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই সফলভাবে পথ অতিক্রম করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার পাঠানো পারসিভিয়ারেন্স রোভার। ২০২১ সাল থেকে লাল গ্রহের পৃষ্ঠে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে আসা এই রোভারটি এত দিন পৃথিবী থেকে পাঠানো নির্দেশনার ভিত্তিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করত। তবে সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে এমন এক প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে রোভারটি নিজেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষের সহায়তা ছাড়াই এই স্বয়ংক্রিয় চলাচল মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ ও ১০ ডিসেম্বর এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই উদ্যোগে একটি উন্নত ভিশন-ল্যাংগুয়েজ মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এই মডেলটি মানুষের মতো করেই মঙ্গল গ্রহের ভূপ্রকৃতির ছবি, ঢাল ও আশপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করতে পারে। মঙ্গলের সঙ্গে পৃথিবীর দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় সংকেত আদান-প্রদানে সময় লাগে, যা রোভার পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতেই এই নতুন এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন এই ব্যবস্থায় রোভারটি আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল নিজেই শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। পাথুরে এলাকা, বালুর ঢেউ কিংবা খাড়া ঢালের মতো বিপজ্জনক অংশগুলো এড়িয়ে নিরাপদ পথ নির্ধারণ করেছে এআই মডেলটি। এ ক্ষেত্রে মার্স রিকনেসান্স অরবিটারের তোলা উচ্চ রেজোল্যুশনের ছবি ও ঢালসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে রোভারটির জন্য নিরাপদ রুট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা আগে পুরোপুরি পৃথিবী থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো।
পরীক্ষার অংশ হিসেবে ৮ ডিসেম্বর পারসিভিয়ারেন্স রোভার এআইয়ের নির্দেশনায় ৬৮৯ ফুট পথ অতিক্রম করে। এর দুই দিন পর ১০ ডিসেম্বর আরও ৮০৭ ফুট এগিয়ে যায় রোভারটি। এই দুই দিনের সফল অভিযানে প্রমাণ হয়েছে যে, রোভারটি মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে চলতে পারে। এটি প্রথমবারের মতো কোনো রোভারকে পৃথিবীর বাইরে অন্য একটি গ্রহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিতভাবে চলাচলের সক্ষমতা দেখাতে সক্ষম করেছে।
নাসার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এই স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনগুলোকে আরও কার্যকর ও সময় সাশ্রয়ী করে তুলবে। পৃথিবী থেকে যত দূরে অভিযান পরিচালিত হবে, তত বেশি এই ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। কারণ সংকেত পৌঁছাতে দেরি হলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এআইভিত্তিক ব্যবস্থা সেই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে পারে।
জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির এক্সপ্লোরেশন সিস্টেম অফিসের ব্যবস্থাপকও এই প্রযুক্তির গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনায় এ ধরনের বুদ্ধিমান প্রযুক্তি অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে। রুট পরিকল্পনার মতো নিয়মিত ও সময়সাপেক্ষ কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হলে প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা গবেষণামূলক কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
মঙ্গল অভিযানে পারসিভিয়ারেন্স রোভারের এই সাফল্য শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং ভবিষ্যতের আন্তঃগ্রহ অভিযানের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। মানুষের উপস্থিতি সীমিত বা অনুপস্থিত থাকলেও কীভাবে যন্ত্র নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে এই পরীক্ষা মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।







Add comment