Bp News USA

ইরানে সরকার বদলালে কী হতে পারে

ইরানে সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ দেশটির রাজনীতিকে এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যার প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশিষ্ট সংবাদদাতা ও লেখক সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আলোকে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সে সময়ের মতো এবারও বৃহৎ একটি মোর্চা গঠনই পরিবর্তনের প্রধান শর্ত হতে পারে। তবে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি করা হলে সম্ভাব্য অর্জন হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।

তেহরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্ষমতার পালাবদল হলে তার গতিপথ সব সময় পূর্বানুমেয় থাকে না। সে সময় ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এলেও আন্দোলনের ভেতরে ছিল নানা মত ও আদর্শের সমাবেশ।

বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধিদল ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা শুরু করেছেন। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান এতটাই গভীর যে সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং সংঘাতের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একাধিকবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন এবং সম্প্রতি বলেছেন, সরকার পরিবর্তনই সবচেয়ে ইতিবাচক পরিণতি হতে পারে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। অনেকের মতে, সরকার পরিবর্তনই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্য এবং তার প্রক্রিয়া হয়তো ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশটিতে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছে, যা আশির দশকের পর সবচেয়ে বিস্তৃত বলে বিবেচিত। মাশহাদ থেকে আবাদান পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এই দৃশ্য অনেককে শাহর পতনের পূর্বমুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যখন লাখো মানুষ রাজপথে অবস্থান নিয়েছিলেন।

অর্থনীতি উভয় সময়েই কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মূল্যস্ফীতিই ছিল প্রধান ক্ষোভের কারণ। প্রায় পাঁচ দশক আগে ১৯৭৭ সালে নিত্যপণ্যের দাম ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তখনও তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ী ও দোকানদাররাই প্রথম প্রতিবাদে নামেন, কারণ তাঁদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছিল।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য হলো দমন, শোক ও প্রতিবাদের পুনরাবৃত্ত চক্র। ১৯৭৮ সালে এক রক্ষণশীল পত্রিকায় ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে কটূক্তির পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কোম শহরে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ছয়জন নিহত হন। এরপর শোকানুষ্ঠান, চল্লিশা পালন এবং নতুন করে প্রতিবাদের ঢেউ দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়। শিয়া মুসলিমদের ৪০ দিনের শোকপালনের রীতি সে সময় আন্দোলনকে ধারাবাহিকতা দেয়।

এক আন্তর্জাতিক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের শিকারদের স্মরণে ৪০ দিনের শোক শেষে দেশব্যাপী রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। একটি বাণিজ্য সংগঠনের টেলিগ্রাম চ্যানেলে জানানো হয়েছে, নিহতদের স্মৃতি অম্লান রাখা এবং জাতীয় গণঅভ্যুত্থান অব্যাহত রাখাই তাদের উদ্দেশ্য।

১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে আন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এক ইতিহাসবিদের মতে, সে সময় প্রায় ২ হাজার ৮০০ জন নিহত হন। অথচ সাম্প্রতিক জানুয়ারিতেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামনে আরও বহু শোকসভা ও চল্লিশা পালনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি সীমিত। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও স্পষ্ট যে ক্ষোভ ছিল বিস্তৃত এবং তা গভীর বঞ্চনা ও বিচ্ছিন্নতার বহিঃপ্রকাশ।

১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালের আন্দোলন ছিল এক বিস্তৃত জোটভিত্তিক সংগ্রাম। ইসলামপন্থী, উদারপন্থী, জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক, নারীবাদী, মধ্যপন্থী আলেম, শিক্ষার্থী, এমনকি পুরোনো ধারার কমিউনিস্ট ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিরাও তাতে অংশ নিয়েছিলেন। সবার লক্ষ্য ছিল শাহর পতন, কিন্তু ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে প্রত্যেকের কল্পনা ছিল ভিন্ন। এই বৈচিত্র্য পরবর্তীতে দুর্বলতায় রূপ নেয় এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ক্ষমতা সংহত করে।

শাহ দেশত্যাগের পরও নতুন শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় সময় লেগেছিল। যুদ্ধ, নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজের মতো নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করা হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের পদ্ধতিগতভাবে নির্মূল করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনেও এসব বাহিনী সক্রিয় ছিল।

বর্তমান বাস্তবতায় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নাও হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, গণঅভ্যুত্থান সফল হলেও পরবর্তী সংগ্রাম আরও দীর্ঘ হতে পারে। মুক্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লড়াই তখনই প্রকৃত অর্থে শুরু হয়।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed