আধুনিক প্রযুক্তির আবির্ভাবের বহু আগেই দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতায় এমন এক তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ব্যবহার ছিল, যা বর্তমান কম্পিউটিং ধারণার সঙ্গে বিস্ময়কর মিল রাখে। প্রায় ৬০০ বছর আগে তারা ‘কুইপু’ নামে পরিচিত এক বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে গিঁট দেওয়া রঙিন সুতা ব্যবহার করে বিশাল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্য সংরক্ষণ করত।
দীর্ঘদিন ধরে গবেষকেরা কুইপুকে শুধুমাত্র হিসাব-নিকাশের একটি উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এর ব্যবহার ছিল আরও বিস্তৃত এবং জটিল। নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কুইপু শুধু সংখ্যাগত তথ্য সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি তথ্য সাজানো এবং প্রক্রিয়াজাত করার একটি কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। অনেকটা প্রাথমিক পর্যায়ের কম্পিউটিং সিস্টেমের মতোই কাজ করত এই পদ্ধতি।
গবেষকদের মতে, কোনো লিখিত লিপি ছাড়াই ইনকা সমাজ কীভাবে বিস্তৃত অঞ্চলের প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষণ ও পরিচালনা করত, কুইপু সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দেয়। একজন গবেষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুইপুর গিঁটগুলো সম্ভবত দশমিকভিত্তিক একটি সংখ্যা পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি গিঁট এবং তার অবস্থান নির্দিষ্ট অর্থ বহন করত, যা তথ্যের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস নিশ্চিত করত।
আরেক গবেষক ধারণা দিয়েছেন, কুইপুতে ভাষাগত উপাদানও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। কিছু গবেষণায় প্রায় ৯৫টি সম্ভাব্য চিহ্নের কথা বলা হয়েছে, যা শব্দ বা ধারণাকে প্রকাশ করতে সক্ষম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কুইপুকে কেবল সংখ্যা নয়, বরং একটি তথ্যভিত্তিক ভাষা বা কোড হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এর কাঠামো আধুনিক তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার মতো, যেখানে তথ্যকে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
একজন কম্পিউটারবিজ্ঞানী কুইপুকে আধুনিক ডেটা স্ট্রাকচারের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা কুইপুকে সরাসরি অনুবাদ করার পরিবর্তে একটি মডেল হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁদের মতে, কুইপুর সুতা একটি প্রধান সুতা থেকে শাখার মতো বিস্তৃত হয়, যা বর্তমান কম্পিউটিংয়ের ‘ট্রি’ ডেটা স্ট্রাকচারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই ধারণাকে ভিত্তি করে গবেষকেরা সি++ এবং পাইথনের মতো প্রোগ্রামিং লজিকে রূপান্তরের চেষ্টা করেছেন এবং কুইপু নীতির ওপর একটি ফাইল ফরম্যাটও তৈরি করেছেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে কুইপু ভিত্তিক কিছু কার্যকরী প্রোটোটাইপও তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্প্রেডশিট মডেল এবং ইমেজ রিপ্রেজেন্টেশন টুল। এই পদ্ধতির অন্যতম বড় সুবিধা হলো, মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই নতুন তথ্য যোগ করা সম্ভব। ফলে আদমশুমারি বা বড় ডেটাসেট ব্যবস্থাপনায় এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
কুইপুর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর নমনীয়তা। বিভিন্ন স্তরে সুতার বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেত। এটি আধুনিক এনক্রিপশনের মতো আলাদা কোনো স্তর নয়, বরং কাঠামোর মধ্যেই তথ্য গোপন রাখার প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। যদিও ইনকারা আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির ধারণা সম্পর্কে অবগত ছিল না, তবুও তাদের পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য সেই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে কুইপুকে সরাসরি কম্পিউটার বলা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ, প্রসেসর বা বাইনারি কোডের মতো আধুনিক উপাদান অনুপস্থিত। তবুও তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় এর দক্ষতা এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য একে প্রাথমিক তথ্যপ্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুইপু শুধু হিসাবের যন্ত্র নয়, বরং একটি সুসংগঠিত তথ্য কাঠামো, যা ইনকা সভ্যতার প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রমাণ বহন করে। এটি প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত অনেক ধারণাই অতীতের সভ্যতাগুলোর মধ্যেই বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান ছিল।





Add comment