ইউক্রেন যুদ্ধে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক কঠিন সত্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি যতই শোনা যাক, প্রত্যেক দেশের উদ্দেশ্য এক নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামানোর আগ্রহ দেখালেও এর পেছনে অনেকটাই রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে। অন্যদিকে রাশিয়া শান্তির নামে এমন দাবি জানাচ্ছে, যা তাদের সামরিকভাবে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তারা দখলে না থাকা অঞ্চল পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে দেখতে চায় এবং ইউক্রেনের সার্বভৌম ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে চায়।
সমস্যার মূল জায়গা হলো—ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হলেও আলোচনা টেবিলে ইউক্রেনকে প্রায়শই সরাসরি জায়গা দেওয়া হয় না। আন্তর্জাতিক ন্যায়নীতির দৃষ্টিতে এটি গভীর উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মার্কিন নেতৃত্ব আগেও রুশ প্রভাবের প্রতি নরম মনোভাব দেখিয়েছে, যা রাশিয়াকে আরও সুবিধাজনক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। রাশিয়া নিশ্চিন্তে দাবি করতে পারছে যে ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যেই আলোচনা হলেই সমাধান বের করা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিকে বদলানোর চেষ্টা করছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি। তাঁদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত পাস হয়নি। রুশ প্রশাসন অবশ্য দোষ দিচ্ছে ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে, যারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করছে। রুশ প্রচারণায় বিশেষ করে ব্রিটেনকে টার্গেট করা হচ্ছে। কিন্তু এটিকে অনেকেই প্রশংসা হিসেবেই দেখছেন, কারণ এটি প্রমাণ করে ইউরোপের নেতৃত্ব ইউক্রেনের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই সংকট ইউরোপের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে? সবচেয়ে বড় বার্তাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে একমাত্র নিরাপত্তা ভরসা ধরে রাখা আর নিরাপদ নয়। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইউরোপবিরোধী মনোভাব এখন বেশি প্রবল। অনেক সিদ্ধান্তে দেখা যায়, তারা ইউরোপকে অংশীদার নয় বরং প্রতিদ্বন্দ্বী বা গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করে। যার মানে হলো—বড় কোনো নিরাপত্তা সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন আর নিশ্চিত নয়।
এই বাস্তবতায় ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও দ্রুত গড়ে তুলতে হবে। মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ, যৌথ সামরিক প্রকল্প, চুক্তি এবং নিরাপত্তা কাঠামোর দৃঢ় রূপায়ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা যথেষ্ট গতিতে এগোচ্ছে না। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি এবং দীর্ঘকালীন যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা এই অগ্রগতিকে থামিয়ে রেখেছে।
এদিকে রাশিয়ার অবস্থান একই রকম কঠোর। তারা এখনো মনে করে যে শান্তির যেকোনো সমাধান তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা তাদের কাছে দরকষাকষির অংশ মাত্র। আর সেই কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো বারবার বলছে—ইউক্রেনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে নেওয়া যাবে না।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে ইউক্রেন যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের সংঘাত নয়। এটি ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো কোন পথে যাবে তারও একটি পরীক্ষা। ইউরোপের সামনে এখন দুই পথ—পুরনো নির্ভরতা ধরে রাখা, নাকি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নিজেদের নিরাপত্তা ও অংশীদারিত্ব নতুনভাবে গড়ে তোলা। আর সিদ্ধান্ত দেরি করলে ভবিষ্যতের বড় সংকটে ইউরোপ আরও অসহায় হয়ে পড়তে পারে।



