রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া বর্তমান সময়ে একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। শরীরে পর্যাপ্ত আয়রনের ঘাটতি হলে এই সমস্যা দেখা দেয়। আয়রন মূলত হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা রক্তের লোহিত কণিকার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। শুধু তাই নয়, হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করতেও আয়রনের অবদান রয়েছে। অনেকেই আয়রনের ঘাটতি পূরণে নিয়মিত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন সাপ্লিমেন্ট নেওয়া সব সময় নিরাপদ নয়। ভালো খবর হলো, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কিছু সহজলভ্য খাবার যুক্ত করলেই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রস্তাবিত দৈনিক ৮ থেকে ১৮ মিলিগ্রাম আয়রনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
নিচে এমন চারটি খাবারের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলো নিয়মিত খেলে আয়রনের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
প্রথমেই আসে পালংশাকের কথা। সবুজ শাকসবজির মধ্যে পালংশাক আয়রনের অন্যতম ভালো উৎস। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় পালংশাক রাখলে ধীরে ধীরে আয়রনের ঘাটতি কমতে পারে। এক কাপ কাঁচা পালংশাকে প্রায় ৩ মিলিগ্রাম আয়রন পাওয়া যায়। রান্না করে খেলে এর পরিমাণ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে, তবে পুষ্টিগুণ অনেকটাই বজায় থাকে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো মুরগি ও গরুর কলিজা। প্রাণিজ খাদ্যের মধ্যে কলিজা আয়রনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ৮৫ গ্রাম মুরগির কলিজা থেকে প্রায় ১১ মিলিগ্রাম আয়রন পাওয়া যায়। একই পরিমাণ গরুর কলিজায় আয়রনের পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। এই হিসাবে দেখা যায়, গরুর কলিজার তুলনায় মুরগির কলিজায় দ্বিগুণেরও বেশি আয়রন রয়েছে। যাঁরা দ্রুত আয়রনের ঘাটতি পূরণ করতে চান, তাঁদের জন্য এটি কার্যকর একটি খাবার হতে পারে।
তৃতীয় খাদ্য উপাদান হলো কুমড়ার বীজ। সাধারণত বাদাম ও বীজজাত খাবার পুষ্টিগুণে ভরপুর হয়ে থাকে। এর মধ্যে কুমড়ার বীজ আয়রনের ভালো উৎস হিসেবে পরিচিত। ২৮ দশমিক ৩৫ গ্রাম কাঁচা ও খোসা ছাড়ানো কুমড়ার বীজে প্রায় আড়াই মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। নাশতা বা হালকা খাবারের সঙ্গে এটি সহজেই খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যায়।
চতুর্থ খাবার হিসেবে রয়েছে মসুর ডাল। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পাশাপাশি মসুর ডাল আয়রনেরও ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম মসুর ডালে প্রায় ৭ দশমিক ২ মিলিগ্রাম আয়রন পাওয়া যায়। যারা নিরামিষ বা কম মাংসভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করেন, তাঁদের জন্য মসুর ডাল একটি কার্যকর বিকল্প।
আয়রন মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো হিম আয়রন, অন্যটি নন হিম আয়রন। হিম আয়রন সাধারণত প্রাণিজ খাদ্য থেকে পাওয়া যায় এবং এটি শরীর খুব সহজে শোষণ করতে পারে। মাংস, হাঁস-মুরগি ও সামুদ্রিক খাবারে থাকা আয়রন এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, হিম আয়রনের জৈবপ্রাপ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
অন্যদিকে নন হিম আয়রন পাওয়া যায় উদ্ভিদজাত খাবার যেমন শাকসবজি, ডাল, বাদাম, শস্য ও দুগ্ধজাত পণ্যে। এই ধরনের আয়রন শরীরের জন্য শোষণ করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। কারণ অনেক উদ্ভিদজাত খাবারে আয়রনের সঙ্গে অ্যান্টি নিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা আয়রনসহ অন্যান্য খনিজের শোষণে বাধা সৃষ্টি করে।
তবে কিছু উপায় অনুসরণ করলে আয়রন শোষণ বাড়ানো সম্ভব। ক্যালসিয়াম ও কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান আয়রন শোষণ কমাতে পারে। যারা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন, তাদের ক্ষেত্রে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও ক্যালসিয়াম আলাদা সময়ে নেওয়া ভালো। এছাড়া ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার, যেমন লেবু বা টক ফল, আয়রন শোষণে সহায়ক ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে নন হিম আয়রনের ক্ষেত্রে। একই সঙ্গে উদ্ভিজ্জ আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ মাংস যোগ করলে শরীর নন হিম আয়রন তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে।
সঠিক খাদ্য নির্বাচন ও খাবার গ্রহণের কৌশল মেনে চললে সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও আয়রনের ঘাটতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।







Add comment