আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত গভীর হচ্ছে

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘাত ছয় মাস পার হওয়ার পরও থেমে নেই। যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেনি, বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে চলমান হামলা ও প্রতিক্রিয়ার কারণে এটি কার্যত একটি যুদ্ধ। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পাকিস্তান পরিচালিত বড় ধরনের হামলা, যেখানে অন্যদিকে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত ইসলামি আমিরাত সরকার।

সোমবার রাতে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ততটা গুরুত্ব পায়নি। পাকিস্তান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা মাদকাসক্তদের হাসপাতালে হামলা চালায়নি; বরং লক্ষ্য ছিল একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে আত্মঘাতী হামলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সংঘাতের সময় কে সত্য বলছে এবং কে মিথ্যা, তা যাচাই করা কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি নকল ভিডিওও এই বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যকার এই সংঘাতকে বোঝার জন্য শুধু সাম্প্রতিক হামলার হিসাব দেখা যথেষ্ট নয়। বিষয়টি গভীরভাবে বোঝার জন্য দুটি দেশের ব্যাখ্যা এবং তাদের ন্যারেটিভ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের লড়াই মূলত সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে হলেও, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বিদেশি আগ্রাসনের সময়—যেমন ১৯৭৯ সালে রাশিয়ার বা ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের—সীমান্তবর্তী পাঠানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিরোধিতা করেছে। তবু বর্তমানে তারা নিজেদের মধ্যে লড়ছে।

মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বিতর্কিত ‘ডুরান্ড লাইন’কে দেখেন। এটি ১৮৯৩ সালে স্থাপিত এবং পাকিস্তানের জন্মের প্রায় ৮০ বছর আগে থেকেই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই সংঘাত সব সময় ঘটে না; সময় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করে কখন সংঘাত প্রকট হয়। কাবুলে বিভিন্ন বিশ্লেষক, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং সাংবাদিকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যের নীতি এবং আফগানিস্তানে নতুন ঘাঁটি স্থাপনের প্রচেষ্টা। আফগান সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের দেশে আর কোনো বিদেশি ঘাঁটি গড়ে তোলা যাবে না।

প্রেস বিবৃতিতে সন্ত্রাসী সংগঠন আল–কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট (একিউআইএস) পাকিস্তানের ভূমিকা সমালোচনা করেছে এবং দাবি করেছে, পাকিস্তান আফগানিস্তানের ওপর সাম্প্রতিক বিমান হামলার মাধ্যমে বিদেশি শক্তিকে সুবিধা দিচ্ছে। আফগানিস্তানের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তিশালী করার জন্য পাকিস্তান এই সংঘাতকে পরিচালনা করছে।

আফগানিস্তানের তালেবান ও পাকিস্তানের টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) মধ্যে গোপন সমঝোতা রয়েছে, যার ভিত্তিতে আফগান তালেবান অতীতে যুদ্ধে সমর্থন করেছে এবং বর্তমানে পাকিস্তানের সীমান্তে ইসলামি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় টিটিপিকে সহায়তা করছে। এ সমঝোতা এবং আফগানিস্তানের ভেতরকার আদর্শগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আফ-পাক সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা হয়। দেশটির সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের মতে, সীমান্তে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে মূলত অভ্যন্তরীণ চাপ এবং সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থান প্রদর্শনের জন্য। আফগান সীমান্তে হামলা পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতা বজায় রাখার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। আফগান সরকার ৬ হাজার টিটিপি যোদ্ধাকে আটক করলেও তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন, কারণ তাদের ধর্মীয় ও আদর্শগত প্রেরণা শক্তিশালী।

বর্তমান সংঘাত কেবল সীমান্ত লড়াই নয়; এতে রয়েছে আঞ্চলিক আধিপত্য, আদর্শগত সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব। সাম্প্রতিক পাকিস্তানি বিমান হামলার পর আফগানিস্তানের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের নজর সীমিত। এই পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ২৬০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্তে সংঘাতের গভীরতা বোঝা জরুরি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed