আদিম ব্ল্যাকহোলের খোঁজে বড় অগ্রগতি

মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও গঠন নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিল রহস্য উন্মোচনের পথে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ এগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাত্ত্বিকভাবে বহু বছর ধরে আলোচিত প্রাইমরডিয়াল ব্ল্যাকহোল বা আদিম কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল। লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই সম্ভাব্য আবিষ্কারের কথা জানিয়েছেন।

সাধারণভাবে পরিচিত কৃষ্ণগহ্বরগুলো সৃষ্টি হয় বিশাল নক্ষত্রের মৃত্যু এবং তার পরবর্তী মহাকর্ষীয় পতনের মাধ্যমে। কিন্তু প্রাইমরডিয়াল ব্ল্যাকহোলের উৎপত্তি একেবারেই ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ঘটে বলে ধারণা করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী প্রথম এক সেকেন্ডের মধ্যেই উপপারমাণবিক পদার্থের অত্যন্ত ঘন অংশ থেকে এই ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম হয়েছিল। ফলে এগুলোর গঠনের জন্য কোনো নক্ষত্রের প্রয়োজন হয়নি।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত অবজারভেটরিটি মূলত মহাকাশ থেকে আসা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করে। যখন দুটি কৃষ্ণগহ্বর একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন স্পেস-টাইমে ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। গবেষক দলের দুই সদস্য এলআইজিওতে শনাক্ত হওয়া একটি নির্দিষ্ট সংকেত বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সেখানে সংঘর্ষে জড়িত একটি বস্তুর ভর সূর্যের ভরের তুলনায় কম।

এই পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, সাধারণ নক্ষত্র থেকে তৈরি কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর সাধারণত সূর্যের ভরের কয়েক গুণ থেকে শুরু করে কোটি কোটি গুণ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু প্রাইমরডিয়াল ব্ল্যাকহোলের ভর তুলনামূলকভাবে অনেক কম হওয়ার কথা। গবেষকদের মতে, সূর্যের চেয়ে কম ভরের একটি কৃষ্ণগহ্বরের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে সেটি কোনো নক্ষত্রের পতন থেকে তৈরি হয়নি, বরং মহাবিশ্বের আদিম পর্যায়ের কোনো প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত।

এই সম্ভাব্য আবিষ্কার বিজ্ঞানের আরেকটি বড় রহস্য, ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার দ্বারা গঠিত, যা সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তাত্ত্বিকভাবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, মহাবিশ্বের শুরুর দিকে বিপুলসংখ্যক প্রাইমরডিয়াল ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়েছিল এবং এগুলোর একটি বড় অংশ বর্তমানে ডার্ক ম্যাটার হিসেবে বিদ্যমান থাকতে পারে।

গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা ২০১৫ সাল থেকে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন গাণিতিক মডেল মিলিয়ে দেখেছেন। এতে দেখা যায়, সূর্যের ভরের চেয়ে কম ভরের এই ধরনের কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বে অত্যন্ত বিরল এবং এই বিরলতার সঙ্গে পর্যবেক্ষিত সংকেতের মিল রয়েছে। ফলে এই আবিষ্কারকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখনই এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ঘোষণা করতে রাজি নন গবেষকরা।

গবেষক দলের একজন সদস্য জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অত্যন্ত শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে হলে এ ধরনের আরও কয়েকটি সংকেত শনাক্ত করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার পরিকল্পিত ইন্টারফেরোমিটার স্পেস অ্যানটেনা ২০৩৫ সালে উৎক্ষেপণ করা হলে এই রহস্য উদঘাটনের গতি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাকাশের গভীর থেকে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হলে আদিম কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ হবে।

এই সম্ভাব্য আবিষ্কার মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা, পদার্থের গঠন এবং অদৃশ্য উপাদান সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed