১৭ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টার্কটিকার বরফে আচ্ছাদিত প্রান্তরে আকাশজুড়ে দেখা যাবে এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য, বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি রিং অফ ফায়ার নামে পরিচিত। বিশ্বের অতি অল্পসংখ্যক মানুষ সরাসরি এই পূর্ণ দৃশ্য উপভোগের সুযোগ পেলেও, গবেষক ও পর্যবেক্ষকদের কাছে ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে দক্ষিণ মেরুর শীতল প্রান্তরে অবস্থানরত বিজ্ঞানীদের মধ্যে এ নিয়ে স্পষ্ট উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটে তখন, যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝামাঝি অবস্থানে আসে, কিন্তু সূর্যের পূর্ণ অংশ ঢেকে ফেলতে সক্ষম হয় না। সাধারণত এই সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে তুলনামূলক বেশি দূরত্বে থাকে। ফলে আকাশে চাঁদকে সূর্যের তুলনায় কিছুটা ছোট দেখা যায়। এর ফলেই সূর্যের কেন্দ্রভাগ আড়াল হলেও চারপাশে থেকে যায় উজ্জ্বল আলোর বৃত্ত। দৃশ্যটি অনেকটা জ্বলন্ত আংটির মতো দেখায়, যা থেকেই রিং অফ ফায়ার নামটির উৎপত্তি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং গতিপথের সমন্বয়ে এই বিরল ঘটনাটি সংঘটিত হয়। মহাকাশীয় গতিবিধির এই নিখুঁত সামঞ্জস্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গবেষকেরা বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করার সুযোগ পান।
আন্তর্জাতিক সময় সকাল ৭টা ১ মিনিটে গ্রহণটি শুরু হবে, যা বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা ১ মিনিট। তথ্যভিত্তিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ওয়েবসাইট টাইম অ্যান্ড ডেট ডটকম জানিয়েছে, গ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায় স্থায়ী হবে প্রায় ২ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সূর্যের চারপাশে আলোর বলয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হবে।
অ্যান্টার্কটিকার কনকর্ডিয়া স্টেশন ও মিরনি স্টেশনে অবস্থানরত বিজ্ঞানীরা গ্রহণটি সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। মূল গ্রহণপথ প্রায় ৭৫৯ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়ে অ্যান্টার্কটিকার জনমানবহীন অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। এ কারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি উপস্থিতিতে পূর্ণ গ্রহণ দেখার সুযোগ কার্যত সীমিত।
অ্যান্টার্কটিকার বাইরের অঞ্চলে গ্রহণের পূর্ণ রূপ দেখা যাবে না। তবে আংশিক গ্রহণ উপভোগ করা যাবে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু স্থানে। আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, বতসোয়ানা, মৌরিতানিয়া ও জিম্বাবুয়ের আকাশে সূর্যের একটি অংশ চাঁদের আড়ালে যেতে দেখা যাবে। এছাড়া ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত এলাকায় অবস্থানরত পর্যবেক্ষকেরাও আংশিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারবেন।
অন্যদিকে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল থেকে এই গ্রহণ দেখা সম্ভব হবে না। ফলে বিশ্বের বৃহৎ অংশের মানুষের জন্য এটি থাকবে কেবল সংবাদ ও বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, এটি মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রহণের সময় সূর্যের প্রান্তবর্তী অংশের উজ্জ্বলতা ও আলোর বিস্তার পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করা যায়। যদিও গ্রহণের স্থায়িত্ব অল্প সময়ের, তবুও এর প্রস্তুতি এবং পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ।
বরফাচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকার আকাশে অগ্নিবলয়ের এই বিরল আবির্ভাব তাই কেবল একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়, বরং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।







Add comment