প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের উত্থান পতন খুব কাছ থেকে দেখেছেন ওয়াল স্ট্রিটের এক প্রবীণ বাজার বিশ্লেষক। তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক অবস্থান করছিল মাত্র ৯৯ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে। অবসর নেওয়ার ঠিক আগের সপ্তাহে সেই সূচকই দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার পয়েন্টে, যা প্রায় ৭০ গুণ বৃদ্ধি। সময়টা ছিল ১৯৭৭ সালের ১৭ মে থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ পথচলার ধারাবাহিকতা।
প্রায় ৪৯ বছরের কর্মজীবন শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস প্রতিষ্ঠান থেকে, যা বর্তমানে S&P Dow Jones Indices নামে পরিচিত। ওয়াল স্ট্রিটে তিনি পরিচিত ছিলেন বাজার বিশ্লেষক হিসেবে, গণমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে এবং তথ্য বিশ্লেষণে দক্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে। কর্মজীবনের শুরুতে ডাও সূচক ছিল ৯০০ পয়েন্টের ঘরে। তাঁর অবসরের এক সপ্তাহ পরই সেই ডাও সূচক ৫০ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করে।
ফ্লোরিডা থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিনিয়োগ ও ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে ধরেন।
প্রথমেই তিনি জোর দেন ঝুঁকি বোঝার ওপর। তাঁর ভাষায়, কী কিনছেন এবং তার ঝুঁকি কতটা, তা না জেনে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। সত্তরের দশকে যখন তিনি কর্মজীবন শুরু করেন, তখন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল বেশি। বর্তমানে সেই সংখ্যা কম হলেও বিনিয়োগের পণ্য বেড়েছে বহুগুণ। এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড, ডেরিভেটিভসসহ নানা ধরনের সিকিউরিটিজ মুহূর্তেই কেনাবেচা করা যায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক হওয়া জরুরি।
সম্প্রতি ডাও ও এসঅ্যান্ডপি সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তিনি মনে করেন, এমন সময়ে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাজারের পরিবর্তনে সম্পদের বণ্টন বদলে গেছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। নিজের ঝুঁকি সহনশীলতা এবং তারল্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শৈশব থেকেই সংখ্যার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর পিতা ছিলেন কর হিসাবরক্ষক। ছোটবেলায় ঘরে বসেই চেক গোছানোর কাজ দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে সত্তরের দশকের শেষ দিকে ম্যানহাটনে এসঅ্যান্ডপিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেন। পুরো কর্মজীবনই তিনি একই প্রতিষ্ঠানে কাটান।
তাঁর মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পুঁজিবাজারকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্যের ১০টি কোম্পানি রয়েছে, যার মধ্যে আটটি প্রযুক্তি খাতের।
ডাও সূচকের ৫০ হাজারে পৌঁছানোকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখলেও একটি গাণিতিক বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ৪৯ হাজার থেকে ৫০ হাজারে ওঠা মানে ২ শতাংশ বৃদ্ধি, যা ১ হাজার থেকে ২ হাজারে ওঠার ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম তাৎপর্যপূর্ণ। তাই পয়েন্টের চেয়ে শতাংশ পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
১৯৮৭ সালের ১৯ অক্টোবরের ‘ব্ল্যাক মানডে’ তাঁর স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল। ওই দিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক একদিনেই ২০ দশমিক ৪৭ শতাংশ পড়ে যায়, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একদিনের পতন। তিনি তখন বিশ্লেষক ছিলেন, পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীও। তাঁর ভাষায়, সেই সোমবার তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হননি, কারণ আগের শুক্রবারই সব বিক্রি করেছিলেন। এছাড়া ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে লেহম্যান ব্রাদার্স ও বেয়ার স্টার্নসের পতন এবং ব্রোকারেজ হাউসের বিকাশও তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
তাঁর মতে, ভালো সময়ে লাভ করাই সব নয়, খারাপ সময়ে সেই সম্পদ ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।
অবসরভাতা ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি নিজে পেনশন বা নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি ৪০১(কে) সুবিধা নিয়ে অবসর নিচ্ছেন। বর্তমানে অধিকাংশ আমেরিকান নির্ধারিত পেনশনের বদলে বিনিয়োগনির্ভর অবসর পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিবারের মোট আর্থিক সম্পদের ৪৫ শতাংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শেয়ারে বিনিয়োগ ছিল, যা ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ।
তাঁর সতর্কবার্তা স্পষ্ট, ঝুঁকি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। সবাই বাজারের উত্থান চায়, কিন্তু পতনের সময় প্রস্তুতি কতটা, সেটাই আসল প্রশ্ন।
অবসরের পর তিনি পড়াশোনায় সময় দিতে চান, বিশেষ করে William Shakespeare-এর রচনা। দাবা খেলায় আরও সময় দেওয়া, স্থানীয় অর্থনীতি ক্লাবে আলোচনা শোনা এবং নতুন শখ যেমন গলফ শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। স্কুলজীবনে গণিত ছিল তাঁর প্রিয় বিষয় এবং দাবা দলের অধিনায়কও ছিলেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে আর সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করার ইচ্ছা নেই বলেই জানান এই প্রবীণ বাজার বিশ্লেষক।







Add comment