যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে তথাকথিত আইসিই ‘ড্রডাউন’ ঘোষণার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। পরিবারগুলো এখনো আতঙ্কে ঘরবন্দি, আর অন্যদিকে বহু বাসিন্দা প্রকাশ্যে প্রতিরোধ ও নজরদারিতে নেমেছেন। ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের প্রভাব শহরজুড়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ মিনিয়াপোলিসের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী ইকুয়েডরের ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী স্মরণ করে, গত সোমবার সকালে তার মা দেড় মাস পর প্রথমবারের মতো বাইরে বেরিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় মা সতর্ক থাকতে বলেন, আর মেয়েটি তাকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করে। সেটিই ছিল তাদের শেষ দেখা। কয়েক সপ্তাহ ধরে খাবার ও অর্থের সংকটে থাকা পরিবারটি স্কুল থেকে পাওয়া খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করছিল। মা দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারায় অতিরিক্ত সহায়তা চাইতেও সংকোচ বোধ করছিলেন।
মেয়েটির ভাষ্য অনুযায়ী, আগের রাতেই মা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি মেয়েকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের খাম কোথায় রাখা আছে তা দেখিয়ে দেন। পরদিন সকালে সংক্ষিপ্ত ফোন কলে মা জানান, ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তারা তাকে অনুসরণ করছেন। কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কর্মকর্তারা তাকে আটক করছেন।
পরবর্তীতে তাকে মিনিয়াপোলিসের ফেডারেল ভবন থেকে প্রায় ১,৪০০ মাইল দূরের টেক্সাসের একটি বিতর্কিত আটক কেন্দ্রে নেওয়া হয় বলে তার আইনজীবী জানান। আশ্রয়ের আবেদন করা ওই নারীকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য আইনজীবী ফেডারেল আদালতের আদেশ নেন। শুক্রবার সকালে তাকে পুনরায় মিনিয়াপোলিসের একটি আটক কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা হয়।
এদিকে হোয়াইট হাউসের সীমান্তবিষয়ক প্রধান জানান, মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে ৭০০ ফেডারেল কর্মকর্তা প্রত্যাহার করা হবে। তবে কয়েকশ জন কমলেও টুইন সিটিজ ও আশপাশে দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা বহাল থাকবেন, যা মিনিয়াপোলিস পুলিশ বিভাগের সদস্যসংখ্যার তিন গুণেরও বেশি।
ড্রডাউন ঘোষণার পরও স্থানীয় অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাস্তবে খুব কম পরিবর্তন এসেছে। স্কুল ও বাসাবাড়ির আশপাশে কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াচ্ছে। ফলে বহু অভিবাসী পরিবার ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছে না।
জানুয়ারিতে ফেডারেল অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। নিকোলেট অ্যাভিনিউতে গড়ে ওঠা অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি, ফুল ও হাতে লেখা বার্তায় নিহতদের স্মরণ করা হচ্ছে। পোস্টারে তাদের পরিচয় তুলে ধরে লেখা হয়েছে, তারা আইসিইর গুলিতে নিহত।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা গাড়ি ও পায়ে হেঁটে কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। হর্ন ও বাঁশি বাজিয়ে প্রতিবেশীদের সতর্ক করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবকেরা কর্মস্থলে যাতায়াত সহায়তা দিচ্ছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের পরিবারকে নজরদারিতে রাখছে এবং খাদ্য, শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ শুরু করে প্রায় তিন হাজার ফেডারেল কর্মকর্তা মোতায়েন করে। প্রশাসন এই অভিযানকে সরকারি নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
সেন্ট পলের একটি গির্জায় চার শতাধিক মানুষ আইসিই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণে অংশ নেন। আয়োজকেরা জানান, ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা সম্ভাব্য ঝুঁকি, এমনকি গ্রেপ্তার বা বলপ্রয়োগের আশঙ্কা নিয়েও আলোচনা করেন।
মিনিয়াপোলিসের উপশহর কলাম্বিয়া হাইটসের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৭০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১০০ জন অনলাইনে পড়াশোনা করছে। অধিকাংশই লাতিনো পটভূমির। স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রতি সপ্তাহে ১৪০ পরিবারকে খাদ্য সরবরাহ করছে। প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবক সাম্প্রতিক অভিযানে আটক হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
আটক হওয়া ইকুয়েডরীয় কিশোরীর মা পরবর্তীতে আবার মিনিয়াপোলিসে ফিরলেও এখনো ফেডারেল ভবনে আটক রয়েছেন। মেয়েটি কয়েকবার ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাকে আশ্বস্ত করেছে। এক পর্যায়ে সে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ঘর পরিষ্কার করে, বিছানা গুছিয়ে এবং বাসন ধুয়ে রেখে আসে, যেন মা ফিরে এলে সবকিছু ঠিকঠাক পান।
শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিস্তম্ভ ও নজরদারি কার্যক্রম প্রমাণ করছে, মিনিয়াপোলিস এখন এক অস্থির সময় পার করছে। অনেক বাসিন্দার ভাষ্য, এই পরিস্থিতি শুধু অভিবাসন ইস্যু নয়, বরং নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।







Add comment