পেশাজীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব ও প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে অনেকেই ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিগত জীবন থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের তাগিদে অনেকে এতটাই সময় ও মনোযোগ ব্যয় করেন যে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, পরিবার কিংবা সামাজিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় আর অবশিষ্ট থাকে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ জীবন বজায় রাখতে কর্মক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এসব নিয়ম মানলে কাজের চাপ কমে এবং ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাজীবনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়।
প্রথম নিয়ম হলো, অফিসকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব না দেওয়া। পেশাগত উন্নতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা যেন ব্যক্তিগত উন্নয়নকে আড়াল না করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ দীর্ঘ সময় অফিসে কাজ করেন এবং সেই সময়ের পর ব্যক্তিগত উন্নয়ন, পরিবার বা সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার মতো সময় প্রায় থাকে না। যে অল্প সময়টুকু পাওয়া যায়, সেটিও আবার পরবর্তী দিনের কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেই শেষ হয়ে যায়।
এর ফলে একজন ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করলেও ব্যক্তিজীবনে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে পারেন। আত্মোন্নয়ন, সচেতনতা এবং মানবিক বোধের বিকাশ মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততার কারণে অনেকেই এই পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ফলে কর্মী হিসেবে দক্ষতা বাড়লেও একজন মানুষ হিসেবে নিজের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহকর্মীদের সঙ্গে সংবেদনশীল বা ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য অনুভূতি প্রকাশ করা এবং কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করা প্রয়োজনীয়। তবে কর্মক্ষেত্রে সব সহকর্মী এই ধরনের বিষয় শেয়ার করার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারেন। অনেক সময় ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করার ফলে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে অথবা গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফলে যে উদ্দেশ্যে কেউ ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করেন, অর্থাৎ মানসিক চাপ কমানোর জন্য, তা উল্টো আরও চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্যই সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে এবং ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করাও অসম্ভব নয়। তবে এ ক্ষেত্রে মানুষের চরিত্র ও পরিস্থিতি ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
অনেক ক্ষেত্রেই সহকর্মীরা শুধুই পেশাগত সম্পর্কের মানুষ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু নন। তাই কর্মক্ষেত্রে একটি স্বাস্থ্যকর সীমারেখা বজায় রাখা নিরাপদ। একইভাবে মানবসম্পদ বিভাগ বা এইচআরকে ব্যক্তিগত আবেগের আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এই বিভাগ মূলত প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন এবং স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব পালন করে।
যেকোনো ছোটখাটো বিরোধ বা সমস্যা দেখা দিলেই তাড়াহুড়া করে মানবসম্পদ বিভাগের কাছে অভিযোগ না করে আগে পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় মূল্যায়ন করা উচিত। প্রয়োজনে তথ্য ও বাস্তব ভিত্তি সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে লিখিতভাবে যোগাযোগ করাই অধিক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
তৃতীয় নিয়ম হলো অফিসকে কখনোই নিজের বাড়ি হিসেবে ভাবা উচিত নয়। অনেকেই কর্মক্ষেত্রকে ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ বলে উল্লেখ করেন। কেউ কেউ আবার এমন ধারণা পোষণ করেন যে যেহেতু দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসে কাটে, তাই সেটিই যেন প্রকৃত বাড়ি। কিন্তু সময়ের পরিমাণ দিয়ে সবকিছু বিচার করা বাস্তবসম্মত নয়।
বাস্তবে কর্মক্ষেত্র একজন মানুষকে কর্মী হিসেবেই বিবেচনা করে। করপোরেট জীবনের বাস্তবতা হলো, কেউ যত বেশি চাপ গ্রহণ করবেন, ততই সেই চাপ বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত দায়িত্ব বা চাপ নিয়ে কাজ করলেও সব সময় পরিস্থিতি সহজ হয়ে ওঠে না।
এ কারণে অফিসে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা জরুরি। নির্ধারিত সময়ে অফিসে যাওয়া, দায়িত্বপূর্ণভাবে কাজ সম্পন্ন করা এবং সময়মতো কর্মস্থল ত্যাগ করা একটি সুস্থ পেশাগত অভ্যাস। অফিস সময়ের মধ্যে নিজের সেরাটা দেওয়াই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তবে পেশাগত সফলতার জন্য যদি কেউ পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সামাজিক সম্পর্ককে অবহেলা করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কর্মজীবনে অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।





Add comment