যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীতির বাইরে গিয়ে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, কোনো ধরনের অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকলেও অনেক আশ্রয়প্রার্থীকে দেশজুড়ে আটক করা হচ্ছে, যখন তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
এই পরিবর্তন এসেছে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করা এবং আইনি পথে থাকার চেষ্টা করা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অতীতে আশ্রয়প্রার্থীদের সাধারণত কমিউনিটিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হতো এবং তাদের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কাজ করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ থাকত। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
আইনজীবী ও অভিবাসন অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পরিস্থিতিতে আশ্রয়প্রার্থীদের আটক হওয়ার একটি নির্দিষ্ট ধারা দেখা যাচ্ছে। একদিন তারা পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছেন, অনেকেই বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এরপর হঠাৎ কোনো কাজে বের হওয়া, কর্মস্থলে যাওয়ার পথে যাত্রা কিংবা দৈনন্দিন কাজের মাঝেই তারা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হয়ে যাচ্ছেন। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থার বিস্তৃত আটক ব্যবস্থার মধ্যে। সেখানে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি আরও কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের জন্যও চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এমন ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। মিনেসোটা, নিউইয়র্ক, ভার্জিনিয়া, ওহাইও, ওকলাহোমা, মেইন, আলাস্কা, উইসকনসিন, ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসসহ নানা জায়গায় আশ্রয়প্রার্থীদের আটক করার ঘটনা সামনে এসেছে।
মেইন অঙ্গরাজ্যে কর্মরত এক আইনজীবী জানান, জানুয়ারির শেষ দিকে সেখানে পরিচালিত এক ফেডারেল অভিবাসন অভিযানে তার ছয়জন আশ্রয়প্রার্থী ক্লায়েন্টকে আটক করা হয়, যদিও তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না। কেউ তখন কর্মস্থলের শিফট শেষ করছিলেন, কেউ কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন, কেউ ওষুধ ও বাজার করতে বের হয়েছিলেন, আবার একজন তার নবজাতকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট করতে যাওয়ার পথে আটক হন।
আইনজীবীর ভাষায়, এমন ঘটনা আগে প্রায় অকল্পনীয় ছিল। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগ পর্যন্তও তিনি তার ক্লায়েন্টদের নিশ্চিন্ত করে বলতেন যে আশ্রয়ের আবেদন চলমান থাকলে তাদের আটক হওয়ার আশঙ্কা নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে এসে আশ্রয় চান। অনেকেই যুদ্ধ, সহিংসতা কিংবা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসেন। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে দুই দশমিক তিন মিলিয়নেরও বেশি মানুষ আশ্রয় সংক্রান্ত শুনানির অপেক্ষায় ছিলেন এবং এই সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক লাখের বেশি আবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন, আর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ অন্য ধরনের অভিবাসন সুবিধা পেয়েছেন। তবে সরকারের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে অনেক আবেদন যথেষ্ট ভিত্তিহীন।
অভিবাসন আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের আটক করার নতুন এই নীতি অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর। কারণ অধিকাংশ আবেদনকারী সরকার কর্তৃপক্ষের কাছে পরিচিত এবং তারা নিয়মিত সরকারি তদারকি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকেন। তাদের অভিযোগ, এসব মানুষকে এমন আটক কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে যেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই, আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন এবং খাবারের মানও নিম্নমানের।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তরের এক মুখপাত্র এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আশ্রয়ের আবেদন চলমান থাকলেই কোনো ব্যক্তির আইনি মর্যাদা তৈরি হয় না। কেউ অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করলে তাকে আটক বা বহিষ্কারের আওতায় আনা যেতে পারে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিই আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পান।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে বা বসবাস করতে ইচ্ছুক বিদেশিদের যাচাই-বাছাই করা তাদের অগ্রাধিকার। তবে সক্রিয় আশ্রয় আবেদন থাকা সত্ত্বেও কতজনকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তারা প্রকাশ করেনি।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে অনেক পরিবারের জীবনে। যুক্তরাষ্ট্রে এক দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করা এক নারী জানান, তার স্বামী কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। পরে জানা যায়, তাকে আটক করা হয়েছে। পরিবারটি ইকুয়েডর থেকে রাজনৈতিক হুমকির মুখে পালিয়ে এসে আশ্রয় চেয়েছিল।
এ ঘটনায় ওই নারীর পরিবার মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। তিনি এখন দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসার চালাচ্ছেন এবং দীর্ঘ সময় কাজ করতে হচ্ছে। তার বড় মেয়ে, যে উচ্চবিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী, কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু এখন সে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য কাজ খোঁজার কথা ভাবছে।
এদিকে আটক স্বামীকে বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফ্লোরিডার একটি বিতর্কিত আটক কেন্দ্র নিয়েও অভিযোগ উঠেছে যে সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মশার উপদ্রব এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাব রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সরকার অস্বীকার করেছে।
আরেক আশ্রয়প্রার্থী ছয় মাসের বেশি সময় আটক থাকার পর শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি এবং তার ছেলে রাজনৈতিক হুমকির কারণে কলম্বিয়া থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তাদের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্রে আইনি পথ অনুসরণ করেই আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, তবুও তাকে আটক করা হয় এবং কেন তা করা হয়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা তারা পাননি।
তার ছেলের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে এসে তারা শূন্য থেকে জীবন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও কাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এই ঘটনা তাদের জীবনের গতিপথ থামিয়ে দিয়েছে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তর সম্প্রতি আরেকটি প্রস্তাবিত নিয়ম সামনে এনেছে, যাতে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় কাজের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারের যুক্তি, ভুয়া আশ্রয় আবেদন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সহজ পথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এতে অভিবাসন ব্যবস্থা চাপে পড়েছে।
অভিবাসন অধিকারকর্মীদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নয়, তাদের পরিবার ও কমিউনিটির জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এমন পরিস্থিতি আগে কখনো কল্পনাও করেননি।





Add comment