যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দেশটির সম্পদ বণ্টনের চিত্র ক্রমেই বৈষম্যমূলক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট সম্পদের বিশাল অংশ এখন অল্পসংখ্যক ধনী পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সেই সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে দেশটির সবচেয়ে বেশি আয় করা ১০ শতাংশ পরিবারের হাতে ছিল জাতীয় সম্পদের ৩২ শতাংশ। দীর্ঘ কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ২০২৫ সালে এসে শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশে।
অর্থনীতিবিদেরা এই প্রবণতাকে “কে-আকৃতির অর্থনীতি” হিসেবে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ অর্থনীতির এক অংশ দ্রুত ওপরে উঠছে, আর অন্য অংশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সহজভাবে বলতে গেলে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের অগ্রগতি হচ্ছে তুলনামূলক ধীর গতিতে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে বিষয়টি কেবল আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন ব্যক্তি বা পরিবারের মালিকানাধীন সম্পদ, বিনিয়োগের সুযোগ এবং অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতাও বৈষম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইতিবাচক বিষয় হলো, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব আয়ের স্তরের মানুষের সম্পদ কিছু না কিছু বেড়েছে। কিন্তু ধনী পরিবারগুলোর সম্পদ বৃদ্ধির হার অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর নিট সম্পদ প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর সম্পদ বৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ সম্পদ বাড়লেও বৃদ্ধির গতি সবার ক্ষেত্রে সমান নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে প্রধান তিনটি কারণ হলো আবাসন খাত, শেয়ারবাজার এবং মূল্যস্ফীতি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট আবাসন সম্পদের অর্ধেকের বেশি মালিকানা রয়েছে শীর্ষ ২০ শতাংশ মানুষের হাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যাঁদের আগে থেকেই বাড়ি ছিল, তাঁদের সম্পদের মূল্যও দ্রুত বেড়েছে।
অন্যদিকে বন্ধকি ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশটির মোট আবাসন সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ রয়েছে নিচের সারির ২০ শতাংশ মানুষের মালিকানায়। এতে আবাসন খাত থেকেই সম্পদের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে।
মহামারির পর পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়। সুদহার কমে যাওয়ার সুযোগে অনেক বাড়ির মালিক পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের বিপরীতে প্রায় ৪৩০ বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সংগ্রহ করেন। এর ফলে যাঁদের সম্পদ ছিল, তাঁরা আরও আর্থিক সুবিধা লাভ করেন।
শেয়ারবাজারও সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারসহ অন্যান্য আর্থিক সম্পদের তিন-চতুর্থাংশের বেশি রয়েছে শীর্ষ ২০ শতাংশ মানুষের হাতে। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী। গত তিন বছরে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ। বিপরীতে নগদ অর্থের গড় বার্ষিক রিটার্ন ছিল ১ শতাংশেরও কম।
মূল্যস্ফীতির প্রভাবও সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে পড়েনি। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে। এসব পণ্যের মূল্য তুলনামূলক বেশি হারে বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের ওপর বেশি পড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিম্ন আয়ের ২০ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে শীর্ষ ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ছিল ৪৬ শতাংশ। এছাড়া যাঁদের বার্ষিক আয় ৪০ হাজার ডলারের কম, তাঁরা ২০২৩ সালের শুরু থেকেই ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো তুলনামূলক স্বাভাবিকভাবে ব্যয় অব্যাহত রাখতে পেরেছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ এবং সেই সম্পদের সুফল এখনো সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। আবাসন ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ যাঁদের রয়েছে, তাঁরা দ্রুত সম্পদশালী হচ্ছেন। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সেই সুযোগ সীমিত হওয়ায় সম্পদের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।





Add comment