Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Homeবিজনেসইরান ইস্যুতে উত্তেজনা, তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

ইরান ইস্যুতে উত্তেজনা, তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

বিশ্ববাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়েছে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট উভয় ধরনের তেলের দাম এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার ৮২ সেন্ট বা প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ ডলার ৮৮ সেন্টে। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারির পর এটি সর্বোচ্চ দাম। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬১ ডলার ৭ সেন্টে পৌঁছেছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১ ডলার ৭১ সেন্ট বা প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। গত এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে এটিও সর্বোচ্চ পর্যায় বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা।

সামগ্রিকভাবে গত সপ্তাহজুড়ে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশেরও বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট তেহরানকে নতুন করে সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভ দমনের নামে হত্যাকাণ্ড কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা হলে এর কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই বক্তব্যের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে, যা সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলে।

এদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরীসহ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী একাধিক যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে। উল্লেখযোগ্য যে, গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছিল, যা এখনো বাজারে উদ্বেগের স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

ইরান সংশ্লিষ্ট চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় শুক্রবার ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ৯টি জাহাজ এবং সংশ্লিষ্ট ৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এই সিদ্ধান্ত বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও জোরালো করেছে।

ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল। ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর ইরান চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদক। একই সঙ্গে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীনের অন্যতম বড় সরবরাহকারী। ফলে ইরানের উৎপাদন বা রপ্তানিতে সামান্য ব্যাঘাতও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখস্তানেও তেল উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি শেভরন জানিয়েছে, দেশটির তেনগিজ তেলক্ষেত্রে এখনো উৎপাদন পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়নি। আগুন লাগার ঘটনার পর শেভরনের নেতৃত্বাধীন অপারেটর প্রতিষ্ঠান ওই তেলক্ষেত্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই পরিস্থিতিতে কাজাখস্তানের তেলশিল্পে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। কৃষ্ণসাগর দিয়ে তেল রপ্তানির পথে আগেই জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এর সঙ্গে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে ওই রুটে তেল পরিবহন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, কাজাখস্তানের মোট তেল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই আসে তেনগিজ তেলক্ষেত্র থেকে। কিন্তু চলতি মাসের বাকি সময়জুড়ে এই তেলক্ষেত্র বন্ধ থাকলে জানুয়ারি মাসে দেশটির দৈনিক উৎপাদন নেমে আসতে পারে মাত্র ১০ থেকে ১১ লাখ ব্যারেলে, যেখানে স্বাভাবিক সময় উৎপাদন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল।

গত সপ্তাহের শুরুতে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টের অবস্থানের কারণে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছিল। পরে ইউরোপের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ ও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি থেকে সরে আসায় দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়। তবে ইরান বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কারণে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে আবারও দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। শনি ও রোববার বিশ্ববাজার বন্ধ থাকায় তখন লেনদেন হয়নি।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম এক সময় ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ ডলারে পৌঁছালেও পরবর্তীতে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিশেষ করে চীনের অর্থনৈতিক গতি শ্লথ হওয়া এবং বিভিন্ন উৎস থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবও সীমিত ছিল। ওপেক উৎপাদন নীতি শিথিল করায় তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরেই ৬০ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে বৈশ্বিক ও স্থানীয় মূল্যস্ফীতির সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে। ২০২২ সালে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments