ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জানান, চলমান উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশটির ওপর কোনো ধরনের মার্কিন সামরিক হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই বিক্ষোভ দমনে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর নির্দেশ দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এই সিদ্ধান্ত অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রোববার এক ভাষণে সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা উচিত, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলে তা আর সীমিত থাকবে না; বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দেশটির জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কেন্দ্র, ব্যাংক ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে। তিনি এসব কর্মকাণ্ডকে সুসংগঠিত অভ্যুত্থানচেষ্টার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জানান, শেষ পর্যন্ত তা দমন করা হয়েছে।
ইরানের এই অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে তিনি আবারও আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, তাঁর বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি সম্ভব। তবে যদি তা না হয়, তাহলে কার অবস্থান সঠিক ছিল, সেটিও সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ইরান সরকার বরাবরই এই বিক্ষোভের পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উসকানির অভিযোগ করে আসছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে ৩ হাজার ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তেহরানের দাবি, নিহতদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে এই সংখ্যার বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সির দাবি, নিহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা ৬ হাজার ৮৪২ জনেরও বেশি, যাদের অধিকাংশই বিক্ষোভকারী।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ হয়ে যায়নি বলে ইঙ্গিত মিলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন, তাহলে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে একটি সুষ্ঠু ও সমতাভিত্তিক চুক্তির সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচলের কয়েকটি দেশ এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
একই সুরে কথা বলেছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের চোখের আড়ালে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও আলোচনার এই প্রচেষ্টার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তবে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা তারা করবে না।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক এখনো চরম উত্তেজনাপূর্ণ হলেও, কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষীণ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছে। এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সংঘাতের দিকে যাবে, নাকি আলোচনার টেবিলে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।



