অজান্তেই আমাদের ঘরের কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস মাস শেষে বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চোখে পড়ার মতো বড় কোনো ভুল না হলেও ছোট ছোট অবহেলা বিদ্যুৎ, পানি ও খাবারের অপচয় বাড়িয়ে দেয়। দিনের পর দিন এই অপচয় চলতে থাকলে তা বছরের শেষে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের টাকায় রূপ নেয়। অথচ সামান্য সচেতনতা আর কয়েকটি অভ্যাস বদলালেই এই অপ্রয়োজনীয় খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রথমেই আসে স্ট্যান্ডবাই ডিভাইসের বিষয়টি। টিভি, ল্যাপটপ, গেম কনসোল কিংবা চার্জার অনেক সময় বন্ধ মনে হলেও পুরোপুরি বন্ধ থাকে না। দেয়ালের সুইচ অন থাকলে এসব ডিভাইস স্ট্যান্ডবাই মোডে বিদ্যুৎ খরচ করতে থাকে। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরিবারের মোট বিদ্যুৎ বিলের প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত আসে এই স্ট্যান্ডবাই ব্যবহারের কারণে। তাই শুধু রিমোট দিয়ে বন্ধ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। ব্যবহার না থাকলে দেয়ালের সুইচ বন্ধ করা বা প্লাগ খুলে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্মার্ট প্লাগ বা স্মার্ট বাল্ব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা জরুরি, কারণ এগুলো সব সময়ই কিছু না কিছু বিদ্যুৎ টানে।
দ্বিতীয় যে অভ্যাসটি খরচ বাড়ায়, তা হলো অল্প খাবারের জন্য বড় ওভেন চালানো। সামান্য খাবার গরম করতে পুরো ওভেন ব্যবহার করলে অকারণে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই ধরনের কাজে মাইক্রোওয়েভ বা এয়ার ফ্রায়ার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে একসঙ্গে বেশি খাবার রান্না করতে হলে বা বড় পরিবারের জন্য রান্না করলে ওভেন ব্যবহার যুক্তিযুক্ত। ওভেন চালানোর সময় একাধিক খাবার একসঙ্গে রান্না করা, বারবার দরজা না খোলা এবং সময় শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ করে ভেতরের তাপ কাজে লাগানোর মতো বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে বিদ্যুৎ বিল কমানো যায়।
তৃতীয় অভ্যাসটি হলো কেটলিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি ফুটানো। এক কাপ চা বা কফি বানাতে গিয়ে অনেকেই পুরো বা অর্ধেক কেটলি ভর্তি পানি ফুটান। এতে বিদ্যুৎ ও সময় দুটোই নষ্ট হয়। হিসাব বলছে, শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ফুটালেই বছরে ভালো অঙ্কের টাকা সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি কেটলির ভেতরে চুন বা লাইমস্কেল জমে গেলে পানি ফুটতে বেশি সময় লাগে, ফলে বিদ্যুৎ খরচও বাড়ে। মাঝেমধ্যে লেবুর রস বা ভিনেগার দিয়ে কেটলি পরিষ্কার করলে এই সমস্যা কমে এবং পানীয়ের স্বাদও ভালো থাকে।
চতুর্থ বড় সমস্যা হলো ফ্রিজে খাবার নষ্ট হতে দেওয়া। খাবার নষ্ট হওয়া মানে সরাসরি অর্থের অপচয়। একটি মাঝারি পরিবারের ক্ষেত্রে বছরে এই অপচয়ের পরিমাণ হাজার টাকারও বেশি হতে পারে। সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা আগে থেকে করা, বাড়তি রান্না হলে ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা, পাকা ফল কেটে রেখে পরে ব্যবহার করা কিংবা শাকসবজি তেলে মিশিয়ে আইস ট্রেতে জমিয়ে রাখার মতো অভ্যাস এই অপচয় কমাতে সাহায্য করে। ফ্রিজার সঠিকভাবে ব্যবহার করলে খাবার নষ্ট হওয়া অর্ধেকের বেশি কমে যেতে পারে।
পঞ্চম অভ্যাসটি হলো সব কাজে দামি ক্লিনিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করা। আলাদা আলাদা ফ্লোর ক্লিনার, গ্লাস ক্লিনার বা কিচেন ক্লিনার কিনতে গিয়ে মাসিক খরচ অযথা বেড়ে যায়। অথচ অনেক পরিষ্কারের কাজেই ঘরোয়া উপকরণ বেশ কার্যকর। সাদা ভিনেগার তেল, দাগ ও চুন পরিষ্কারে ভালো কাজ করে। লেবু দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। বেকিং সোডা শক্ত দাগ তুলতে এবং কার্পেটের গন্ধ দূর করতে কার্যকর। এসব সহজ উপকরণ ব্যবহার করলে খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও চাপ কমে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, টাকা বাঁচাতে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনলেই মাস শেষে তার সুফল পাওয়া যায়। আজ থেকেই ঘরে কোথায় বিদ্যুৎ, পানি বা খাবার অকারণে নষ্ট হচ্ছে, সেদিকে নজর দিলে বছর শেষে সঞ্চয়ের অঙ্ক নিজেই চোখে পড়বে।



