Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Homeঅন্যান্যপাওয়ার ন্যাপ কেন, কখন, কার জন্য

পাওয়ার ন্যাপ কেন, কখন, কার জন্য

ব্যস্ততা আর টানা কাজের চাপে দিনের মাঝামাঝি সময়ে শরীর ও মস্তিষ্কের শক্তি কমে আসা এখন প্রায় সবার পরিচিত অভিজ্ঞতা। ঠিক তখনই অল্প সময়ের একটি ঘুম অনেকের কাছে স্বস্তির মতো কাজ করে। এই স্বল্পস্থায়ী ঘুমকেই বলা হয় পাওয়ার ন্যাপ। সময় খুব বেশি না হলেও সঠিক নিয়মে নেওয়া হলে এটি কর্মক্ষমতা, মনোযোগ এবং মানসিক সতেজতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তবে পাওয়ার ন্যাপের ক্ষেত্রে সময়, পরিবেশ ও ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার বিষয়গুলো জানা জরুরি। না জানলে উপকারের বদলে ক্ষতিও হতে পারে।

পাওয়ার ন্যাপের মূল ধারণা হলো কম সময়ের মধ্যে গভীর বিশ্রাম নিশ্চিত করা। দীর্ঘ ঘুম নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত বিরতি নেওয়াই এর লক্ষ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক দৈর্ঘ্যের ন্যাপ মস্তিষ্ককে দ্রুত রিচার্জ করতে সাহায্য করে এবং কাজের গতি বাড়ায়।

সময় নির্ধারণ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে ১০ থেকে ২০ মিনিটের পাওয়ার ন্যাপকে সবচেয়ে কার্যকর ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে শরীর গভীর ঘুমের স্তরে প্রবেশ করে না, ফলে ঘুম ভাঙার পর কোনো ভারী ভাব বা জড়তা থাকে না। অনেকেই একে সুপার পাওয়ার ন্যাপ বলে থাকেন, কারণ এটি খুব দ্রুত সতেজতা ফিরিয়ে আনে।

৩০ মিনিট ঘুমানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। আধা ঘণ্টার ঘুমে অনেকের মধ্যে স্লিপ ইনার্শিয়া দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় ঝিমুনি বা মনোযোগের ঘাটতি অনুভূত হয়। এই অবস্থা কাটাতে আবার সময় লাগে, যা কাজের ক্ষতি করতে পারে।

যাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে, তাঁরা চাইলে ৬০ থেকে ৯০ মিনিটের একটি ন্যাপ নিতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণ ঘুমচক্র সম্পন্ন হয়। এর ফলে স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীলতার উন্নতি হতে পারে। তবে এটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে রাতের ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই সচেতন থাকা জরুরি।

দিনের কোন সময়ে ন্যাপ নেওয়া সবচেয়ে ভালো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেলা একটা থেকে তিনটার মধ্যে পাওয়ার ন্যাপ সবচেয়ে কার্যকর। দুপুরের খাবারের পর শরীরের শক্তির মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। এই সময় অল্প ঘুম শরীরকে নতুন করে চাঙ্গা করতে পারে। তবে বিকেল চারটার পর ন্যাপ না নেওয়াই ভালো, কারণ এতে রাতের স্বাভাবিক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকে।

পাওয়ার ন্যাপ সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। অফিসে দীর্ঘ সময় একনাগাড়ে কাজ করা কর্মীদের জন্য এটি বেশ উপকারী। দুপুরের পর যাঁদের মনোযোগ কমে যায়, তাঁদের কাজের গতি বাড়াতে ন্যাপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক, বিশেষ করে পরীক্ষার আগে বা দীর্ঘ সময় পড়াশোনার চাপ থাকলে। শিফট ওয়ার্কারদের জন্য পাওয়ার ন্যাপ অনেক সময় অপরিহার্য হয়ে ওঠে, কারণ তাঁদের কাজের সময়সূচি অনিয়মিত। একইভাবে, দীর্ঘ পথ গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভারদের জন্য ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ন্যাপ ক্লান্তি কমাতে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে সহায়তা করতে পারে।

অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে পাওয়ার ন্যাপ এড়িয়ে চলাই ভালো। যাঁরা অনিদ্রায় ভোগেন, তাঁদের দিনের বেলা ঘুমানোর অভ্যাস রাতের ঘুমের সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও দিনের অনিয়মিত ঘুম শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলতে পারে। আবার যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অবসাদ বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন, তাঁদের জন্য পাওয়ার ন্যাপের চেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বেশি প্রয়োজনীয়, কারণ এটি অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

পাওয়ার ন্যাপ থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি। ন্যাপের জন্য শান্ত ও কিছুটা অন্ধকার পরিবেশ বেছে নেওয়া ভালো। প্রয়োজনে আই মাস্ক বা ইয়ার প্লাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। সময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবশ্যই অ্যালার্ম সেট করা দরকার, যাতে ঘুম ২০ মিনিটের বেশি না হয়। কেউ কেউ কফি ন্যাপ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ঘুমানোর ঠিক আগে এক কাপ কফি পান করলে ক্যাফেইন শরীরে কাজ শুরু করার সময়ের মধ্যেই ঘুম শেষ হয়, ফলে জেগে ওঠার পর সতেজতা আরও বাড়ে। ন্যাপের সময় ফোন সাইলেন্ট রাখা জরুরি, যাতে নোটিফিকেশন ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পাওয়ার ন্যাপ কোনো আলসেমির পরিচয় নয়। এটি মস্তিষ্ক ও শরীরকে নতুন করে সক্রিয় করার একটি বৈজ্ঞানিক উপায়। সঠিক সময়ে, সঠিক দৈর্ঘ্যে এবং নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে ন্যাপ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে কর্মদক্ষতা ও মানসিক ভারসাম্য দুটিই বজায় রাখা সম্ভব।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments