ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত তিন দিনের আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এমন সময়ই ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক আকারে বিমান হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ হামলাকে দেশটির ওপর পরিচালিত অন্যতম বৃহত্তম আক্রমণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আলোচনার শেষদিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই দূতের সঙ্গে ফোনালাপকে গঠনমূলক বলে উল্লেখ করেন। তবে ইউক্রেনীয় ও মার্কিন উভয় পক্ষই বলেছে, যেকোনো ধরনের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করছে মস্কো শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সত্যিকারের আগ্রহ দেখাচ্ছে কি না সে বিষয়ে। এই অবস্থান আলোচনার গতি থমকে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, শুক্রবার রাত থেকে রাশিয়া ৬৫৩টি ড্রোন ও ৫১টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জ্বালানি স্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে এ হামলার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত আক্রমণে অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোট ২৯টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই হামলায় সাময়িকভাবে জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে পারমাণবিক চুল্লিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানায়, রুশ দখলে থাকা কেন্দ্রটির ছয়টি নিস্ক্রিয় চুল্লি ঠান্ডা রাখতে সচল বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জানান, জ্বালানি স্থাপনাগুলো ছিল হামলার মূল নিশানা। রাজধানী কিয়েভের কাছে ফাস্তিভ শহরের একটি রেলস্টেশন ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ৫৮৫টি ড্রোন ও ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলে রুশ অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যে কতটা ভিন্নমুখী তা এই আলোচনার অচলাবস্থা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
দোনেৎস্কের পোকরোভস্ক শহরের খুব কাছে পৌঁছে গেছে রুশ বাহিনী। পাশের মিরনোহরাদ শহরকেও প্রায় চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে তারা। লুহানস্ক অঞ্চল কার্যত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে এবং খেরসন পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকাতেও তাদের প্রভাব শক্তিশালী। এসব এলাকায় যুদ্ধক্ষেত্র মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও ধীরে ধীরে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। শুধু নভেম্বর মাসেই তারা প্রায় ৫০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে বলে ইউক্রেনীয় সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে আসন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট লন্ডনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও জার্মান চ্যান্সেলরও উপস্থিত থাকবেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়ার ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
এর আগে মস্কোতে মার্কিন দূতদের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্টের বৈঠকেও কোনো সমঝোতা হয়নি। পরে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য চুক্তিতে অগ্রগতি পুরোপুরি নির্ভর করছে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি জানিয়েছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে রুশ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা শান্তি আলোচনার কারণে স্থগিত হবে না। তিনি বলেন, এ ধরনের পরোয়ানা স্থগিতের একমাত্র উপায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত। তার মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
রুশ প্রেসিডেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে তাদের দাবি থেকে তারা সরে দাঁড়াবে না এবং শীতকালজুড়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।



