শীতের তীব্রতা, প্রচণ্ড বাতাস আর চোখে অন্ধকার করে দেওয়া তুষারঝড় কত দ্রুত পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে, তা টের পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের এক তরুণী। প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে শিকাগো থেকে ইন্ডিয়ানাপোলিসে যাওয়া সেই তরুণীর সপ্তাহান্তের ভ্রমণটি পরিণত হয়েছিল জীবনের অন্যতম বিপদসংকুল অভিজ্ঞতায়।
১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সালের শীতকাল। প্রেমিকের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর সোমবার ভোরে তিনি চাকরিতে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু এ যাত্রায় সামনে অপেক্ষা করছিল তুষারঝড়। তিনি উঠে পড়েছিলেন ইন্টারস্টেট ৬৫ এ, ঠিক সেই সময়ই শুরু হয় ভয়ানক ব্লিজার্ড। তীব্র বাতাস আর তুষারপাতের ফলে দৃষ্টিসীমা প্রায় শূন্য হয়ে আসে। ১৯৯৫ সালের তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করলে যানটি আটকে যায় গভীর তুষারের মধ্যে। তখনো তিনি জানতেন না কী করতে হবে। গাড়ির বাইরে বের হয়ে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও গাড়িকে বের করতে ব্যর্থ হন। শীতের পোশাক, কম্বল বা জরুরি সরঞ্জাম কিছুই ছিল না। আর পূর্বাভাসও দেখেননি।
প্রতি বছরই অনেক মানুষ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে বিপদে পড়েন। ব্লিজার্ড কেবল শীতকালেই হয় না। বছরের বিভিন্ন সময়েই তা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এটি ঘটে এমন অঞ্চলেও যেখানে সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল এবং গ্রেট প্লেইনস এলাকায় এ ধরনের ঝড় বেশি দেখা যায়। বিশ্বজুড়েও রাশিয়া, উত্তর ইউরোপ, কানাডা, উত্তর এশিয়া এবং অ্যান্টার্কটিকায় তা সাধারণ ঘটনা।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস অনুযায়ী, যখন টানা তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে প্রবল তুষারপাত বা উড়ে আসা তুষার, ঘণ্টায় ৩৫ মাইলের বেশি বেগের বাতাস এবং দৃষ্টিসীমা এক চতুর্থাংশ মাইলের কম থাকে, তখন তাকে ব্লিজার্ড বলা হয়। এই ঝড় শুধু দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দেয় না, বরং তাপমাত্রা এত নিচে নামিয়ে আনে যে দ্রুত হাইপোথারমিয়া বা ফ্রস্টবাইটের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত হলো সচেতনতা এবং প্রস্তুতি। ভ্রমণের আগে অন্তত এক সপ্তাহ আগেই আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করা উচিত এবং যাত্রার দিন যত এগিয়ে আসে তত ঘন ঘন পূর্বাভাস দেখা প্রয়োজন। পরিস্থিতি খারাপ হলে ভ্রমণ স্থগিত করাই উত্তম। পুরো পথের আবহাওয়া সম্পর্কে জানা জরুরি, বিশেষ করে যদি পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করতে হয়।
শরীর উষ্ণ রাখতে সঠিক পোশাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পাতলা কিন্তু বহুস্তরীয় কাপড় পরলে শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখা সহজ হয়। টুপি, হাতে মোটা গ্লাভস, পানি প্রতিরোধী জ্যাকেট এবং পায়ের জন্য উষ্ণ জুতা অপরিহার্য। বাইরে থাকলে মুখ ঢেকে রাখা উচিত, কারণ অতিরিক্ত ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসে প্রভাব ফেলতে পারে।
রোড ট্রিপে বের হলে গাড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ সেফটি কিট রাখা উচিত। এতে থাকতে হবে সারভাইভাল ব্ল্যাঙ্কেট, শাবল, বরফ গলানোর উপাদান, স্ক্র্যাপার, ওয়াটার বোতল, ফ্ল্যাশলাইট, অতিরিক্ত চার্জার, জাম্পার কেবল এবং মৌলিক মেরামত সরঞ্জাম। যাত্রার আগে টায়ার চাপ, টায়ারের অবস্থা, ওয়াইপার ফ্লুইড এবং তেল পরীক্ষা করা জরুরি।
যদি গাড়ি তুষারে আটকে যায়, প্রথমে নিরাপদ হলে টায়ারের আশপাশের বরফ সরানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। বালু বা কার্ডবোর্ড ব্যবহার করে চাকা ঘোরার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব হলে গাড়ি বের হতে পারে। সম্ভব না হলে সাহায্যের জন্য জরুরি সেবা সংস্থায় যোগাযোগ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, গাড়ি থেকে বের না হয়ে ভেতরেই থাকা উত্তম, কারণ তুষারঝড়ের মধ্যে হাঁটতে বের হলে পথ হারানোর সম্ভাবনা বেশি। সামান্য সময়ের জন্য গাড়ির ইঞ্জিন চালিয়ে তাপ পাওয়া যেতে পারে, তবে জানালা একটু খোলা রাখতে হবে এবং নিষ্কাশন পাইপ বরফমুক্ত রাখতে হবে।
প্রকৃতিতে হাঁটা, স্কিইং বা ক্যাম্পিংয়ে গেলে সঠিক সরঞ্জাম থাকা জরুরি। ফুটওয়্যার, হেডল্যাম্প, ম্যাপ, কম্পাস, প্রথম চিকিৎসা কিট, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার এবং জরুরি সংকেত পাঠানোর যন্ত্র বহন করা প্রয়োজন। কখনোই একা যাওয়া উচিত নয় এবং কোথায় যাচ্ছেন তা কাউকে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন।
স্কি রিসোর্টে অবস্থানকারীদেরও সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় পূর্বাভাস দেখে স্কি পেট্রোলের নম্বর সংগ্রহ করে রাখা উচিত। ঠান্ডার কারণে ফোন দ্রুত ব্যাটারি হারায়, তাই ফোনটি ভেতরের পকেটে রাখা উত্তম। জরুরি অবস্থার জন্য সিটি এবং স্পেস ব্ল্যাঙ্কেটও রাখা উচিত।
যদি পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় এবং আশ্রয় না পাওয়া যায়, শরীর উষ্ণ রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তুষার গুহা বা অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করে ঝড় থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বরফ খেয়ে পানি সংগ্রহ করা উচিত নয়, কারণ এতে শরীরের তাপমাত্রা আরও কমে যায়।
ঐ তরুণী ভাগ্যক্রমে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গাড়ির ভেতরে থাকায় তিনি বিপদ এড়াতে সক্ষম হন। অবশেষে এক স্থানীয় বাসিন্দা তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। কয়েকদিনের ঝামেলা শেষে তিনি বাড়ি ফিরতে সক্ষম হন। সেই ঘটনার পরে তিনি একটাই শিক্ষা পেয়েছিলেন, যাত্রা যত ছোট বা জরুরি মনে হোক না কেন, আবহাওয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া নিরাপদ থাকার অন্য কোনো পথ নেই।



