Sunday, November 30, 2025
spot_img
Homeইমিগ্রেশন তথ্যভারতের গুজরাটি হোটেল সাম্রাজ্যের অজানা কাহিনি

ভারতের গুজরাটি হোটেল সাম্রাজ্যের অজানা কাহিনি

নতুন একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ভেসে ওঠা কিছু শৈশবের দৃশ্য দর্শকদেরকে নিয়ে যায় এক বিস্ময়কর বাস্তবতায়। সাদা গ্রাজুয়েশন গাউন পরা শিশুদের সারি, বিয়ের আনুষ্ঠানিক ছবির মুহূর্ত, অথবা জন্মদিনের কেক কাটায় মেতে থাকা আত্মীয়স্বজন। সব ছবির পটভূমিতেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মোটেল। আর এগুলোর বেশিরভাগই ছিল ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের মালিকানাধীন।

চলচ্চিত্রটির সহপরিচালক এবং বর্ণনাকারী নির্মাতা নিজেও এমন পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন। তার পরিবার গ্যাস স্টেশন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ঘনিষ্ঠ পরিজনদের অনেকেই পরিচালনা করতেন মোটেল। কিন্তু কৈশোরে তিনি এসব কাজকে দেখেছেন শ্রমসাধ্য নীল কলারের পেশা হিসেবে এবং সে সময় একটু সংকোচও কাজ করত তার মনে।

বর্তমানে বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে নির্মাতা নিজের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে বিচার করছেন। একই সঙ্গে চাইছেন দর্শকরাও এই গল্পকে ভিন্নভাবে দেখুক। নিউ ইয়র্কের ট্রাইবেকা ফেস্টিভ্যালে জুন মাসে প্রিমিয়ার হওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য প্যাটেল মোটেল স্টোরি’ এই মাসজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

চলচ্চিত্রটি শুরুতেই তুলে ধরে এক আশ্চর্য পরিসংখ্যান। নির্মাতার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল ও মোটেল খাতের ষাট শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা, যদিও তারা পুরো দেশের মাত্র এক শতাংশ জনসংখ্যা। তার শৈশবের মোটেলপাড়ার দিনগুলো যে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ ছিল, তা তিনি উপলব্ধি করেন পরে। তিনি স্বজনদের রীতিমতো রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করেন।

এই গল্পের সূত্রপাতের খোঁজে চলচ্চিত্র নির্মাতারা খুঁজেছেন উত্তর। এরই অংশ হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হোটেল মালিকদের বার্ষিক সম্মেলন পরিদর্শন করেন। এই আয়োজনকে অনেকে বলে আতিথেয়তা শিল্পের সুপার বোল। প্রায় বিশ হাজার সদস্যের এই সংগঠন এতটাই প্রভাবশালী যে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও এখানে বক্তৃতা দেন।

সেখানে বহু হোটেল মালিকের সঙ্গে আলাপের পরও একটি প্রশ্নই ছিল সবচেয়ে বড় রহস্য। কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সফলতার যাত্রা। অবশেষে ক্যালিফোর্নিয়ার এক গবেষকের সহায়তায় তারা খুঁজে পান সেই সূত্র। তিনি বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় হোটেল মালিকদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। সেখানেই উঠে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যিনি এক সময় তুচ্ছভাবে উল্লেখিত হলেও তার ভূমিকা ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী এই ব্যক্তিই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় হোটেল মালিকানার জনক।

গুজরাট থেকে আসা এই পথপ্রদর্শক যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে। শ্রমজীবী জীবন থেকে শুরু করে স্যাক্রামেন্টোর এক হোটেলের পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া এবং পরে সান ফ্রান্সিসকোতে নিজস্ব হোটেল লিজ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নবাগত অভিবাসীদের ভরসাস্থল। তিনি নিয়মিত উপদেশ দিতেন নিজের পরিচিতজনদেরকে যে ব্যবসা শুরুর জন্য মোটেলই হতে পারে সবচেয়ে ভালো সুযোগ।

তার পাঠানো উৎসাহব্যঞ্জক চিঠি পেয়ে যেসব পরিবার আমেরিকায় পা রাখে তাদের অনেকেই প্রথম আশ্রয় পেয়েছিল তার হোটেলে। পরবর্তীতে তারা লিজ নিত নিজের মতো করে হোটেল এবং গড়ে তোলে ব্যাপক ব্যবসা। এক পরিবার জানায়, বর্তমানে তাদের চার শতাধিক সদস্যই হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং চার প্রজন্ম ধরে তারা এই খাতে কাজ করছে। সেই পরিবারের একজন জানালেন কীভাবে শিশু বয়সেই ফোন রিসিভ করা, রুম পরিষ্কার বা রান্নাঘর সামলানো ছিল নিত্যদিনের দায়িত্ব এবং একইসঙ্গে ছিল আনন্দময় স্মৃতি।

এখন সেই পরিবারগুলোর অনেকেই পরিচালনা করছেন বহু হোটেলসমৃদ্ধ কোম্পানি। চলচ্চিত্রে তাদের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে আন্তরিকভাবে। তারা জানান, সেই সময়ের সন্তানরা প্রায়ই নিজেদেরকে হোটেলের করিডোরে বড় হতে দেখা শিশু হিসেবে ভাবেন। কখনো সেটাই ছিল তাদের খেলার মাঠ।

‘দ্য প্যাটেল মোটেল স্টোরি’ মূলত এই পথপ্রদর্শকের কাহিনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হলেও নির্মাতারা জানিয়েছেন, দেশে দেশে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও শতাধিক হোটেল মালিকের গল্প তারা লিপিবদ্ধ করতে আগ্রহী। কারণ এক প্রজন্মের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে এসব মৌলিক ইতিহাসের। তাদের ভাবনা, এসব গল্প ভবিষ্যতে হয়তো পূর্ণাঙ্গ ধারাবাহিক বা বড় বাজেটের সিনেমাতেও রূপ নিতে পারে।

চলচ্চিত্রের শেষে প্রদর্শিত হয় বিভিন্ন হোটেল মালিকের পরিচয় দেওয়ার দৃশ্য। কারও মুখে দক্ষিণাঞ্চলের টান, কারও মাথায় কাউবয় হ্যাট। সবাই আমেরিকান, এবং অনেকের একই পরিচয়। তারা প্যাটেল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments