যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের ডিগ্রি নিয়ে দীর্ঘদিনের যে ইতিবাচক ধারণা বিদ্যমান ছিল, সাম্প্রতিক এক জরিপ সেই ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। NBC News পরিচালিত সর্বশেষ জনমত জরিপে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিবন্ধিত ভোটার জানিয়েছেন যে চার বছরের কলেজ ডিগ্রি এখন আর খরচের তুলনায় তেমন মূল্য রাখে না। গত এক দশকের তুলনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে বিশেষজ্ঞরা অস্বাভাবিক এবং আমেরিকান ড্রিমের একটি মূল উপাদানের প্রতি আস্থাহীনতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন যে চার বছরের ডিগ্রি এখনো মূল্যবান, কারণ এটি একটি ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদে বেশি আয়ের সুযোগ বাড়ায়। বিপরীতে ৬৩ শতাংশের মতে, ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই নির্দিষ্ট চাকরি দক্ষতা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা নিয়ে বের হন, ফলে এর আর্থিক যৌক্তিকতা কমে যায়।
২০১৩ সালে CNBC পরিচালিত একই ধরনের জরিপে ৫৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেছিলেন যে ডিগ্রি সার্থক বিনিয়োগ। ২০১৭ সালে করা আরেকটি জাতীয় জরিপে জনগণ প্রায় বিভক্ত ছিল। এই বারো বছরের ব্যবধানে জনমতের এমন নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার, বাড়তে থাকা টিউশন ফি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির রূপান্তর।
জরিপ পরিচালনাকারী এক ডেমোক্র্যাটিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন যে এই পরিবর্তনকে বিস্ময়কর বলা যায়। একসময়ের আকাঙ্ক্ষিত একটি ডিগ্রি এখন অনেকের কাছে অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক ঝুঁকির প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, শুধু ডিগ্রিহীন মানুষেরাই নয়, বরং সব শ্রেণির মানুষই এই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে।
শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্নদের আয় তুলনামূলক বেশি এবং বেকারত্বের হার কম থাকে। তবে পাল্টে গেছে শিক্ষার খরচের চিত্র। কলেজ বোর্ডের মতে, ১৯৯৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি চার বছরের কলেজে ইন স্টেট শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাস্তবমূল্যে দ্বিগুণ হয়েছে। বেসরকারি কলেজগুলোর খরচও একই সময়ে ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ই ডিগ্রির মূল্য নিয়ে সন্দেহের সবচেয়ে বড় কারণ।
ডেট্রয়টে বসবাসকারী এক তরুণ পরিবেশনকর্মী জানান যে শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে অতিরিক্ত ঋণের চাপ শিক্ষার আসল সুফলকে কমিয়ে দেয়। তাঁর মতে, অনেক শিক্ষার্থী চার বছরের ডিগ্রি অর্জনের পর চাকরিজীবনের চাপে আগের কম আয়ের কাজেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। ফলে শিক্ষা ব্যয় তার প্রতিদান দিতে পারে না।
জরিপে রাজনৈতিক ভাবধারার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৩ সালে রিপাবলিকান ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি ডিগ্রিকে মূল্যবান মনে করতেন। বর্তমানে সেই হার নেমে এসেছে মাত্র ২২ শতাংশে। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রেও আস্থা কমেছে, যদিও তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ডিগ্রিধারী ভোটারদের মধ্যেও এখন অর্ধেকের কম মানুষ বিশ্বাস করেন যে চার বছরের ডিগ্রি খরচের তুলনায় মূল্যবান।
ডানঘেঁষা একটি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক সিনিয়র ফেলো মনে করেন যে বাস্তব অভিজ্ঞতা জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। কেউ কেউ ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেন না, কারো ডিগ্রি শ্রমবাজারে প্রত্যাশিত মূল্য দেয় না, আবার কেউ অতিরিক্ত ব্যয় করে যা পরবর্তীতে লাভজনক হয় না। এসব ব্যতিক্রম এখন নিয়মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তিগত শিক্ষায় আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই দ্রুত কর্মসংস্থানে প্রবেশের সুযোগ থাকা পেশাভিত্তিক কোর্স বা স্বল্পমেয়াদি ডিগ্রিকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করছেন।
ভার্জিনিয়ার এক যুবক জানান যে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জনে তাঁর আগ্রহের প্রধান কারণ ভবিষ্যৎ আয় নিশ্চিত করা। তবে তাঁর মতে, শিল্পকলা বা থিয়েটারের মতো বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনকারীরা একই সুযোগ পান না, ফলে এসব ডিগ্রি তুলনামূলক কম খরচে হওয়া উচিত।
আইওয়ার এক চাকরিজীবী জানান যে ডিগ্রির মূল্য মূলত নির্ভর করে খরচের ওপর। তিনি সাশ্রয়ী পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে বড় ঋণ ছাড়াই পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁর স্বামীর বেসরকারি কলেজের ডিগ্রি এখনো পরিবারকে ঋণের বোঝা বইতে বাধ্য করছে। তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রির প্রকৃত মূল্য নয়, বরং এটি চাকরির দরজায় কড়া নেড়ার একটি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা।
শেষ এক দশকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থাও কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ ব্যয়ের কারণে কলেজগুলো এখন অনেকের কাছে দূরত্ব তৈরি করেছে। তাই শিক্ষাকে সত্যিকারের মূল্যবান করতে হলে তা নাগালের মধ্যে আনা জরুরি।
জরিপটি ২৪ থেকে ২৮ অক্টোবর ১ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। এর ত্রুটি মাত্রা প্লাস বা মাইনাস ৩ দশমিক ১ শতাংশ।



