বৃহৎ নক্ষত্রের জীবনের শেষ পর্যায় সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল বরাবরই ছিল প্রবল। এই কৌতূহলের জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সম্প্রতি মৃতপ্রায় নক্ষত্র রেড স্পাইডার নেবুলার এক বিস্ময়কর চিত্র প্রকাশ করেছে। নাসার তথ্যমতে, এই নেবুলার বৈজ্ঞানিক নাম এনজিসি ৬৫৩৭ হলেও এটি রেড স্পাইডার নেবুলা নামেই বেশি পরিচিত। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে সংগৃহীত নতুন ছবির মাধ্যমে এমন কিছু তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, যা আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি।
প্রকাশিত ছবিতে নেবুলার প্রধান অংশ বা লোব অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। নীলাভ রঙের এই লোবের ভেতর বুদ্বুদ আকৃতির দীর্ঘায়িত কাঠামো লক্ষ্য করা যায়, যার বিস্তৃতি আনুমানিক তিন আলোকবর্ষ পর্যন্ত। ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নেবুলাটিকে ধূলিকণা এবং গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত এক বিশাল মেঘ বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, মহাকাশে এই কাঠামোটি যেন কোনো বিশাল আকারের মহাজাগতিক প্রাণী হামাগুড়ি দিচ্ছে এমন এক বিভ্রম সৃষ্টি করে। সংস্থাটি জানিয়েছে যে পৃথিবী থেকে প্রায় তিন হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নেবুলা একটি নক্ষত্রের জীবনের চূড়ান্ত ধাপ সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম।
নক্ষত্রের বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে তার বাইরের স্তর ধীরে ধীরে খসে যেতে থাকে এবং সেই সঙ্গে গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল খোলস তৈরি হয়। এই অবস্থাটিই রেড স্পাইডার নেবুলার মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। নাসার ব্যাখ্যায় জানা গেছে যে নেবুলার লোবগুলো আণবিক হাইড্রোজেনের আলো নির্গমনের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। এই আণবিক হাইড্রোজেন দুটি হাইড্রোজেন পরমাণুর বন্ধনে গঠিত। হাজার বছর ধরে নেবুলার কেন্দ্র থেকে নির্গত গ্যাস ক্রমাগত এই বিশাল বুদ্বুদ আকৃতির কাঠামোগুলোকে স্ফীত করেছে। গবেষকদের ভাষ্যমতে সূর্যের মতো যেকোনো নক্ষত্র জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে লোহিত দৈত্যে রূপান্তরিত হয় এবং শেষ মুহূর্তে তার বাইরের স্তর মহাকাশে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এই স্তর খসে পড়ার পর নক্ষত্রের কেন্দ্র উন্মুক্ত হয় এবং তা ধীরে ধীরে শ্বেত বামনে পরিণত হয়। কেন্দ্র থেকে নির্গত তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ বাইরের খসে পড়া বস্তুগুলোকে আলোকিত করে তোলে। এ কারণেই নেবুলাগুলোর স্বতন্ত্র রঙ এবং আভা তৈরি হয় যা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। নতুন ছবিগুলো শুধু নেবুলার চেহারা বোঝার জন্য নয় বরং নক্ষত্রের জীবনচক্র ও তার শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে বলেও মনে করছেন গবেষকরা।
বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে রেড স্পাইডার নেবুলা ভবিষ্যতে আমাদের সূর্যের সম্ভাব্য পরিণতির একটি রূপক চিত্র বলে বিবেচিত হতে পারে। তাদের মতে প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্য যখন তার জ্বালানি শেষ করবে তখন সূর্যের বাইরের স্তর ধীরে ধীরে খসে পড়ে এমন ধরনের নেবুলা সৃষ্টি হতে পারে। সেই সময় সূর্যের কেন্দ্র শ্বেত বামনে রূপান্তরিত হবে এবং তার চারপাশে সৃষ্টি হবে ধূলিকণা ও গ্যাসের বিশাল আলোকিত খোলস। তাই রেড স্পাইডার নেবুলা শুধু একটি মহাজাগতিক দৃশ্যই নয় বরং আমাদের নক্ষত্রের দূর ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য প্রতিচ্ছবি।
এই বিস্ময়কর চিত্র এবং গবেষণা তথ্য ভবিষ্যৎ মহাকাশবিজ্ঞানীদের জন্য নতুন গবেষণার দ্বার উন্মোচন করেছে। নেবুলার অভ্যন্তরীণ কাঠামো, বাইরের গ্যাসের বিস্তৃতি এবং কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের বিবর্তন সম্পর্কে এই নতুন তথ্যগুলো মহাজাগতিক পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মহাকাশ গবেষণার নতুন দিগন্তও সৃষ্টি করেছে।



