Sunday, November 30, 2025
spot_img
Homeকমিউনিটি সংবাদনিউইয়র্কে আলোচনায় ডিজিটাল কৌশলবিদ

নিউইয়র্কে আলোচনায় ডিজিটাল কৌশলবিদ

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নরকে পরাজিত করে উঠে আসেন দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত তরুণ প্রার্থী। পরবর্তীতে ৪ নভেম্বরের মূল নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করে তিনি শুধু নিউইয়র্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও তৈরি করেন নতুন আলোচনার কেন্দ্র। তাঁর জনপ্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তৃত প্রচার এবং তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল তখন ব্যাপকভাবে নজর কাড়ে।

কিন্তু এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিলেন আরেকজন তরুণ, যিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হলেও জন্মেছেন যুক্তরাষ্ট্রেই। তিনি একটি বাংলাদেশি পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন দক্ষ কৌশলবিদ, যিনি দীর্ঘ এক দশক ধরে রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শক্তিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে আসছেন। এই ব্যক্তিত্বই ছিলেন পুরো প্রচারের প্রধান উপদেষ্টা, যিনি গত ফেব্রুয়ারি থেকে মেয়র নির্বাচনের প্রার্থীর পাশে কাজ করেছেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। তাঁর দেয়া এক বিশেষ পরামর্শই গড়ে দেয় পুরো প্রচার কৌশলের ভিত্তি।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নবনির্বাচিত মেয়রের এক উপদেষ্টা জানান, এই কৌশলবিদ প্রার্থীর কাছে পরামর্শ দিয়েছিলেন, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বানানো কল্পিত নিউইয়র্ককে ভুলে গিয়ে প্রকৃত নিউইয়র্কের বাস্তব জীবনকে কেন্দ্রে রেখে বার্তা তৈরি করতে। এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় এক তৃণমূলভিত্তিক প্রচার কাঠামো, যেখানে ৯০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন এবং যেসব ভোটার এতদিন উপেক্ষিত ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হয়।

ফ্লোরিডা থেকে জাতীয় পর্যায়ে যাত্রা

এই যোগাযোগ কৌশলবিদ বড় হয়েছেন সাউথ ফ্লোরিডায়, যেখানে তাঁর পরিবার বাস করত বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে। সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার সময় তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের গল্প কীভাবে জনমত তৈরি করে এবং প্রযুক্তি সেই গল্প বলার ধরনকে কীভাবে বদলে দিতে পারে। বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন চিন্তাশীল কিন্তু প্রাণবন্ত, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি নিয়ে সমানভাবে আগ্রহী একজন মানুষ। পরবর্তীতে এই সমন্বয়ই তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

ওবামার প্রচার দল থেকে অভিজ্ঞতা

প্রায় ৩৫ বছর বয়সী এই কৌশলবিদের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে। সেখানেই প্রথমে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিয়ে পরে ফ্লোরিডা ডিজিটাল কনটেন্ট ডিরেক্টরের দায়িত্ব পান। এখানে তিনি শেখেন, কীভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোটারদের সচেতন ও সংগঠিত করা যায়। পরে তিনি হোয়াইট হাউসের ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি অফিসে কাজ করেন এবং এরপর যোগ দেন উবারে, যেখানে তিনি রাইড শেয়ারিং সংক্রান্ত নীতি তৈরির কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আরেক প্রার্থীর প্রচারে কাজ করার পর যোগ দেন একটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনে যোগাযোগ পরিচালকের পদে। ফ্যাশন, রাজনীতি, শিল্প ও বিনোদনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করে তিনি জনসংযোগের দক্ষতা আরও উন্নত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি নেটফ্লিক্স, মারায়া কেরি এবং এ২৪ স্টুডিওর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্টদের পরামর্শ দিয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে তাঁর ভূমিকা

এই প্রচারের মূল শক্তি ছিল সরাসরি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র অনলাইন প্রচার যথেষ্ট নয়, মাঠে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগই আসল পার্থক্য গড়ে দেবে। প্রচারের সময় ব্যস্ত সূচির মধ্যেও প্রার্থী নানা ভাষায় শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রায় ১০ লাখ মানুষের শহর নিউইয়র্কে তিনি ঘন ঘন মসজিদে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। যাঁরা বহু বছর ধরে কোনো প্রাইমারি নির্বাচনে ভোট দেননি, তাঁরাই এবার নতুন করে ভোট দিতে আগ্রহী হয়েছেন।

আক্রমণাত্মক প্রচারের সময়েও কৌশলটি সমান কার্যকর ছিল। সাবেক গভর্নর প্রার্থীর সমর্থকদের নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করলে কৌশলবিদ তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ জানান। তাঁর ভাষায়, মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এমন বক্তব্য ছিল এক মরিয়া প্রচেষ্টা, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

এই প্রচারে আরও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সদস্য। তাঁদের মধ্যে ফিল্ড ডিরেক্টর পরিচালনা করেছেন বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী, যারা প্রাইমারির সময় ১৬ লাখ পরিবারের দরজায় পৌঁছেছেন এবং সরাসরি আলোচনা করেছেন প্রায় আড়াই লাখ ভোটারের সঙ্গে। চূড়ান্ত নির্বাচনের আগে স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

পুরো প্রচারকে বলা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কার্যক্রম এবং আধুনিক ডিজিটাল কৌশলের সমন্বয়। অনলাইনে প্রার্থীর ভিডিওগুলো কোটি কোটি বার দেখা হলেও প্রচার দল জানিয়েছে, তাঁদের লক্ষ্য ছিল শুধু ভোট চাওয়া নয়, বরং প্রকৃত যোগাযোগের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিটি হলে উত্তরণ

সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই কৌশলবিদের যাত্রা এখন পৌঁছেছে নিউইয়র্ক সিটি হলে। সে যাত্রা দেখায়, আধুনিক রাজনীতিতে যোগাযোগ কীভাবে রূপ বদলে দিয়েছে। সরকার, করপোরেট এবং সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই তিনি গল্পের শক্তিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন।

নির্বাচনে বিজয়ের পর ঘোষিত ট্রানজিশন টিমে তিনিও জায়গা পেয়েছেন। এই দলে আছেন আরও কয়েকজন নারী যারা আগামী জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নবনির্বাচিত মেয়রকে সহায়তা করবেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments