শার্লটের অভিবাসন অভিযানকে ঘিরে ঘটে গেলো এক অদ্ভুত অস্থিরতার পর্ব, যেখানে প্রশাসনিক বার্তা আর মাঠের বাস্তবতা একে অপরকে ছাপিয়ে গেলো। বৃহস্পতিবার দুপুরে ফেডারেল নিরাপত্তা বিভাগের এক সহকারী সচিবের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় শেরিফের ঘোষণা স্পষ্টভাবেই সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। শেরিফের দাবি ছিলো যে সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা তাদের অভিযান শেষ করেছে, অথচ ফেডারেল কর্তৃপক্ষ জানাল যে কার্যক্রম এখনও চলছে এবং শিগগিরই তা বন্ধের কোনো পরিকল্পনা নেই।
এই বক্তব্যের টানাপোড়েনের পরও বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল পরিষ্কার। শার্লট এলাকায় গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ফেডারেল সংস্থার গতিবিধি নজরে রেখেছিলো স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। শেরিফের ঘোষণার আগে তারা দেখেছিলো একটি বড় কনভয় দক্ষিণমুখে অ্যাটলান্টার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় নাগরিকদের একাংশ বলছে, এই ধরনের অভিযানে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই যেন উদ্দেশ্য।
রাজনৈতিক চরিত্র অনুযায়ী বিভিন্ন শহরে অভিবাসন অভিযানের প্রতিক্রিয়া বদলে যায়। কোথাও তীব্র বিক্ষোভ, কোথাও নাটকীয় প্রতিবাদ দেখা গেলেও শার্লট ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। এখানে ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে থাকা সাধারণ মানুষই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়, যা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পক্ষে সরাসরি টার্গেট করা কঠিন হয়ে ওঠে। অভিবাসী ও লাতিনো সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো একটি শক্তিশালী সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যাতে শহর থেকে দূরের পাহাড়ি এলাকা পর্যন্ত খবর পৌঁছে যায় দ্রুত।
অভিযান শুরুর আগেই উত্তর ক্যারোলিনাজুড়ে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিলো অভিবাসন সংস্থার তৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্য। সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা শহরে আসার পর তারা পাড়া মহল্লায় টহল জোরদার করে। মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে বাধা যেন না হয়, সেটিই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কারণ সাধারণ দিনেও সকালবেলা কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে বহু মানুষ অভিবাসন সংস্থার হাতে আটক হয়।
শহরের বিভিন্ন হোটেল, পার্কিং এলাকা, এমনকি সুপারস্টোরের পেছনের নিরিবিলি স্থানগুলোতেও নজরদারি চালানো হয়। কখন কোথায় অভিযান চালানো হতে পারে, তা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা ছিলো সংগঠনগুলোর। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সময়ই কাজের গাড়িগুলোকে লক্ষ্য করা হয় সকাল সকাল। এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের ফলেই ৪৭টি গাড়ির একটি কনভয় শার্লট ছেড়ে অ্যাটলান্টার দিকে যাত্রা করছে এমন ভিডিও প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে শহর ও কাউন্টি প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ছিল নীরব। অভিবাসীদের সমর্থনে সাধারণ বিবৃতি দেওয়া হলেও ফেডারেল অভিযানের সরাসরি বিরোধিতা দেখা যায়নি। রাজনৈতিক বাস্তবতা তার বড় কারণ। রাজ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের সমান শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান এবং আইনসভায় রিপাবলিকানদের প্রভাব স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক রেখেছে।
অক্টোবরের শুরুতে রাজ্যে কার্যকর হওয়া অপরাধী অবৈধ অভিবাসী আইন অনুযায়ী গুরুতর অভিযোগে আটক কারো ক্ষেত্রে শেরিফদের বাধ্যতামূলকভাবে অভিবাসন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। এই আইন পাশ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। স্থানীয় শেরিফ জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আটক ব্যক্তিকে অভিবাসন সংস্থার হাতে তুলে দিতে তারা বাধ্য।
ফেডারেল সংস্থার এক প্রধান কর্মকর্তা সম্প্রতি টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়ে এই প্রতিবাদের ধরনকে উপহাস করে বলেন যে তাদের কাছে এটি এক ধরনের ধর্মীয় গোষ্ঠীর মতো আচরণ বলে মনে হয়েছে। যদিও শহরের পুলিশ বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে তারা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই বলেছে সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা এলাকা ছেড়ে গেছে।
শার্লটের প্রতীক বহুদিন ধরেই একটি বোলতা। ইতিহাস বলছে বিপ্লবী আমলে ব্রিটিশ বাহিনী এই শহর দখলের পর স্থানীয়দের তীব্র প্রতিরোধে বিব্রত হয়ে মাত্র ষোলো দিনের মধ্যেই সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আজও অনেকের মতে সাম্প্রতিক অভিযানের আকস্মিক সমাপ্তি সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধেরই প্রতিফলন।



