চীন ও তাইওয়ান ইস্যুতে সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের অবস্থানকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়ায় তীব্র কূটনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জাপানের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা একজন নেতা তাইওয়ান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ার পর বেইজিং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। চীন সরাসরি ওই মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানালেও টোকিও জানিয়েছে, বক্তৃতাটি জাপানের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক অবস্থানেরই পুনরুল্লেখ।
এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরের মধ্যে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। চীন স্পষ্টভাবে সতর্ক বার্তা দেওয়ার পরও জাপান অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং টোকিও একে তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান। টোকিওর কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়তো তাইওয়ান বিষয়ে তাদের প্রচলিত সমর্থন দুর্বল করতে পারেন। কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে বেইজিং আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারে এবং পূর্ব এশিয়ায় নতুন সংঘাতের সূত্রপাত ঘটতে পারে।
এই পরিস্থিতির মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট টেলিফোনে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা নেতাকে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে গত মঙ্গলবার এই ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাপান সরকারের দুটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও উত্তেজনা দেখতে চান না বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি জাপানকে কোনো নির্দিষ্ট দাবি জানাননি। বেইজিং মন্তব্য প্রত্যাহারের যে দাবি তুলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সে বিষয়ে কোনো চাপ প্রয়োগ করেননি।
এখন পর্যন্ত জাপান তাদের অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ঘোষণা দেয়নি। জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে টোকিওর কিছু কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে বাণিজ্য চুক্তির চাপের মুখে তাইওয়ান নীতির সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে।
সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্র নীতিবিষয়ক এক জাপানি অধ্যাপকও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানকে প্রায়ই একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
উল্লেখ্য, জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের কথাও হয়েছে। সেখানে তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিং তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে দেখে এবং একত্রীকরণকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মনে করে। কিন্তু তাইওয়ান নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনের সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে একটি বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে চলছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাপানের সঙ্গেও চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সফল বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
চীন ও জাপানের চলমান উত্তেজনার কারণে টোকিওর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চীন তাদের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করায় দেশটির পর্যটন খাতও চাপের মুখে পড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই ফোনালাপের সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছে যেখানে দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্র চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।



